স্পেন
ব্লোকাসের সমাবেশ ঘিরে শনিবার বার্সেলোনায় কী ঘটেছিল
বার্সেলোনার রাস্তায় তরুণদের থামিয়ে তল্লাশি ও পরিচয় যাচাইয়ের ছবি।
বার্সেলোনার কেন্দ্রীয় এলাকায় গত ২৪ অক্টোবরের দাঙ্গা, ভাঙচুর ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ৩১ অক্টোবর শনিবার ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় কাতালোনিয়ার পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লোকাস (Blocus) গোষ্ঠীর নামে প্লাসা কাতালুনিয়া, আর্ক দে ত্রিয়ম্ফ ও পাসেইগ দে গ্রাসিয়ায় সমাবেশের ডাক ছড়িয়ে পড়ার পর বিকেল থেকেই শহরের কেন্দ্রজুড়ে শুরু হয় তল্লাশি ও পরিচয় যাচাই। দোকানপাটের সামনে বসানো হয় কাঠের ও ধাতব সুরক্ষাপ্যানেল, বন্ধ রাখা হয় কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ এবং সরিয়ে নেওয়া হয় রাস্তার কনটেইনার। দিন শেষে পুলিশের হিসাবে বার্সেলোনায় ১ হাজার ৪৪০ জনকে শনাক্ত করা হয় এবং ১২৭টি প্রশাসনিক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। তবে আগের সপ্তাহের মতো বড় ধরনের দাঙ্গা, সংঘবদ্ধ লুটপাট বা ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।
বিকেল ৩টা থেকে শুরু হয় পুলিশের বিশেষ অভিযান
সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে শনিবার বিকেল ৩টা থেকেই বার্সেলোনার কেন্দ্রীয় এলাকায় বিশেষ পুলিশি অভিযান শুরু হয়। মোসোস দ’এসকোয়াদ্রা এবং বার্সেলোনার নগর পুলিশের সদস্যরা প্লাসা কাতালুনিয়া, পোর্টাল দে ল’আঞ্জেল, পাসেইগ দে গ্রাসিয়া, আর্ক দে ত্রিয়ম্ফ ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন।
৩ কাতইনফো-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্সেলোনায় ৫০০-র বেশি মোসোস সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা ও বিশেষ নজরদারি দলও মাঠে ছিল। শহরে প্রবেশের বিভিন্ন পথ, রেলস্টেশন ও মেট্রোতে যাত্রীদের পরিচয় যাচাই এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হয়।

পুলিশের লক্ষ্য ছিল এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, যাঁদের কাছে দোকানের কাচ ভাঙা, ভাঙচুর কিংবা লুটপাটে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন সরঞ্জাম রয়েছে। হ্যালোইন উপলক্ষে অনেকের মুখোশ ও ছদ্মবেশী পোশাক পরার বিষয়টিও পুলিশের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
প্লাসা কাতালুনিয়ায় সমাবেশের ডাক, কিন্তু বড় জমায়েত হয়নি
ব্লোকাসের প্রচারিত পোস্টার ও অনলাইন বার্তায় শনিবার বিকেল ৫টায় প্লাসা কাতালুনিয়া এবং লুইস কোম্পানিস এলাকায় জমায়েতের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরে রাত ৮টায় পাসেইগ দে গ্রাসিয়ার কাসা মিলা বা লা পেদ্রেরার কাছেও আরেকটি কর্মসূচির কথা ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু পুলিশি তৎপরতা, পরিচয় যাচাই এবং আগাম সতর্কতার মধ্যে এসব ঘোষিত কর্মসূচি বড় কোনো সমাবেশে রূপ নেয়নি। লা ভানগার্দিয়ার সরাসরি ঘটনাপ্রবাহের প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্ক দে ত্রিয়ম্ফের বিকেল ৫টার কর্মসূচিতে কেউ উপস্থিত হয়নি। রাত ৮টায় লা পেদ্রেরার পাশের ঘোষিত জমায়েতও কার্যত ফাঁকা ছিল।
এ ছাড়া শেষ মুহূর্তে প্লাসা উরকিনাওনা ও গ্লোরিয়েস এলাকায় নতুন জমায়েতের বার্তা ছড়ানোর খবর পায় পুলিশ। সেসব স্থানেও উল্লেখযোগ্য জমায়েতের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে শনিবারের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো শহরের কেন্দ্রকে আগের সপ্তাহের মতো সংঘর্ষের এলাকায় পরিণত করতে পারেনি।
এক হাজারের বেশি মানুষকে শনাক্ত, জব্দ বিভিন্ন সরঞ্জাম
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের পরিচয় যাচাই ও তল্লাশির পরিধি বাড়তে থাকে। প্রথমদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ৪৫০ জনকে শনাক্ত এবং ১৫টি সন্দেহজনক বস্তু জব্দের কথা জানানো হয়েছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পরিচয় যাচাইয়ের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছায়।

পরবর্তী সময়ে ১ নভেম্বর প্রকাশিত মোসোসের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের অভিযানে বার্সেলোনায় মোট ১ হাজার ৪৪০ জনকে শনাক্ত করা হয়। এ ছাড়া ১২৭টি প্রশাসনিক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে সম্ভাব্য বিপজ্জনক সরঞ্জাম ও নিষিদ্ধ পদার্থ জব্দের বিষয়ও রয়েছে।
পুলিশি তল্লাশিতে ছুরি বা অন্যান্য ধারালো অস্ত্র, মুখ ঢাকার মুখোশ, আতশবাজি এবং দোকানের কাচ ভাঙতে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম পাওয়া যায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
শনিবার বার্সেলোনায় মোট তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় মোসোস। তাঁদের মধ্যে দুজন প্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। অন্যজন অপ্রাপ্তবয়স্ক, যাঁকে পুলিশের কাজে বাধা ও নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে আটক করা হয়। তবে এই তিনটি গ্রেপ্তারের সবকটিই ব্লোকাসের ঘোষিত সমাবেশে সহিংসতায় অংশ নেওয়ার কারণে হয়েছে, এমন নয়।
কনটেইনার সরানো, মেট্রো ও বাস চলাচলে বিধিনিষেধ
সম্ভাব্য লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঠেকাতে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার দুই হাজারের বেশি আবর্জনার কনটেইনার সরিয়ে নেয় বার্সেলোনা নগর কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সিউতাত ভেয়া এলাকার ১৩টি, ইশাম্পলের ১৬টি এবং গ্রাসিয়ার একটি, মোট ৩০টি বাইসিং স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
গণপরিবহনেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। প্লাসা কাতালুনিয়া, সান্তস ও পাসেইগ দে গ্রাসিয়া রেলস্টেশনের কয়েকটি প্রবেশপথ বন্ধ রাখা হয়। মেট্রোর এল১ লাইনে উরকিনাওনা ও আর্ক দে ত্রিয়ম্ফ, এল২ ও এল৩ লাইনে পাসেইগ দে গ্রাসিয়ার কয়েকটি প্রবেশপথ এবং এল৪ লাইনে উরকিনাওনার একটি প্রবেশপথ বন্ধ করা হয়।
বাস চলাচলেও পরিবর্তন আসে। ভি১৭, ৩৯ ও ৪৭ নম্বর বাসের রুট পরিবর্তন করা হয় এবং কয়েকটি স্টপেজ সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়। ডি৫০, ভি১৯, ৬ ও ১৯ নম্বর বাসও নির্দিষ্ট কিছু স্টপেজে থামেনি।
৩ কাতইনফো জানিয়েছে, রাত ১০টার পর বন্ধ রাখা মেট্রো প্রবেশপথগুলো আবার খুলে দেওয়া হয় এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
আরিবাউ ও করসেগা সড়কে তিনটি কনটেইনারে আগুন
শনিবার বিকেলে বার্সেলোনার আরিবাউ ও করসেগা সড়কের সংযোগস্থলে তিনটি আবর্জনার কনটেইনারে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। আগুনে পাশের একটি বারের বাইরের কিছু আসবাব ও সাজসজ্জার সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
তবে লা ভানগার্দিয়া ও অন্যান্য স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন লাগার কারণ তখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ বা নগর কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির সঙ্গে ব্লোকাসের কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নিশ্চিত করেনি। ফলে এটিকে ব্লোকাসের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাতেও পুলিশের নজরদারি, মেয়রের বক্তব্য
শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বার্সেলোনার মেয়র জাউমে কোলবোনি নগর পুলিশের সদর দপ্তর থেকে দিনের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, শহরে দিনটি শান্তিপূর্ণভাবে কেটেছে এবং আগের সপ্তাহের সহিংসতা পুনরাবৃত্তি হয়নি। তাঁর মতে, পুলিশ, নগর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রস্তুতির কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রাত তখনো শেষ হয়নি এবং পুলিশের অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। শহরে ভাঙচুর ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
লা ভানগার্দিয়ার রাত ১০টার প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্ক দে ত্রিয়ম্ফ ও লা পেদ্রেরার ঘোষিত কর্মসূচিগুলোতে লোকজনের উপস্থিতি না থাকলেও মোসোস ও নগর পুলিশ রাতভর সতর্ক অবস্থানে ছিল। শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সমন্বয় কেন্দ্র থেকেও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
গত সপ্তাহের ঘটনার তদন্তে নতুন গ্রেপ্তার
৩১ অক্টোবরের নিরাপত্তা অভিযানের পাশাপাশি গত ২৪ অক্টোবরের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় তদন্তও অব্যাহত ছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে ব্লোকাসের যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ পরিচালনার অভিযোগে ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে শনিবার কাব্রেরা দ’আনোইয়া থেকে গ্রেপ্তার করে মোসোস দ’এসকোয়াদ্রা। পুলিশের দাবি, তিনি সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের সমন্বয়ের জন্য ব্যবহৃত একটি যোগাযোগ গ্রুপের প্রশাসক ছিলেন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিকটকে ছড়ানো একটি পোস্টারের কিউআর কোডের মাধ্যমে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। গ্রেপ্তার তরুণের বিরুদ্ধে আগের শনিবারের সহিংস কর্মকাণ্ড উসকে দেওয়া ও সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ২৪ অক্টোবরের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিষয়ে আদালত ও কিশোর বিচারব্যবস্থার কার্যক্রমও চলছিল। লা ভানগার্দিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন কিশোরের বিরুদ্ধে নজরদারি, জমায়েত থেকে দূরে থাকার নির্দেশ এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থার আবেদন করেছে কিশোর আদালতের কৌঁসুলিরা।
কাতালোনিয়াজুড়ে ২ হাজার ২৬৪ জন শনাক্ত
শুধু বার্সেলোনা নয়, ব্লোকাসের নামে কাতালোনিয়ার বিভিন্ন শহরেও কর্মসূচির ডাক ছড়িয়েছিল। বাদালোনা, মাতারো, তেরাসা, গাভা, জিরোনা, ইগুয়ালাদা, লেইদা ও ফিগেরেসে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় পুলিশ। এসব এলাকার কিছু স্থানে আগাম সতর্কতামূলকভাবে কনটেইনার ও রাস্তার অন্যান্য সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়।
কাতালোনিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের হিসাব উদ্ধৃত করে ৩ কাতইনফো জানিয়েছে, পুরো কাতালোনিয়ায় মোসোস ও নগর পুলিশ মোট ২ হাজার ২৬৪ জনকে শনাক্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে মোসোস ১ হাজার ৮০০ জন এবং নগর পুলিশ ৪৬৪ জনকে শনাক্ত করে। অঞ্চলজুড়ে মোট ১৮১টি প্রশাসনিক অভিযোগ নথিভুক্ত হয় এবং প্রায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাঁদের সবার গ্রেপ্তারের সঙ্গে ব্লোকাসের সহিংস কর্মসূচির সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।
শনিবারের ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, ব্যাপক পুলিশি প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে বার্সেলোনায় ঘোষিত সমাবেশগুলো বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নেয়নি। তবে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলে দিনভর এর প্রভাব ছিল। প্রশাসনও জানিয়েছে, ব্লোকাসের নামে নতুন কর্মসূচি বা সহিংসতার আশঙ্কা থাকায় নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
| তথ্যসূত্র:** 3CatInfo, La Vanguardia, betevé, Europa Press, EFE, elDiario.es







