বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ
রিয়াদে রক্তাক্ত হামলা, এবার কি ইয়েমেনের যুদ্ধে নামছে যুক্তরাষ্ট্র?
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। হামলার কারণে বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়, বহু ফ্লাইট বাতিল হয় এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ইয়েমেনের হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে সরাসরি যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই নতুন একটি যুদ্ধে জড়াবে? সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর কীভাবে বারবার হামলার লক্ষ্য হচ্ছে? ইরান ও হুতিদের মধ্যে সম্পর্ক কী? আর এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজার, জ্বালানি সরবরাহ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিমানবন্দরে হামলার বাইরেও পুরো আঞ্চলিক পরিস্থিতি বুঝতে হবে।
কেন এই হামলায় পরবর্তী পরিস্থিতি জটিল হতে পারে?
১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনাসংশ্লিষ্ট তিন ও চার নম্বর টার্মিনাল এলাকার একটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হন।
নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং আটজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। বিদেশিদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের নাগরিক রয়েছেন।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। তবে সর্বশেষ হামলার পর হুতিরা তাৎক্ষণিকভাবে এর দায় স্বীকার করেনি। তাই অভিযোগ ও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
এটি শুধু একটি বিমানবন্দরে হামলা নয়। একটি দেশের রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে আঘাত হানা মানে দেশটির পরিবহনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হওয়া।
রিয়াদ সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বিমান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ী, বিদেশি কর্মী, পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ওপরও প্রভাব পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যে একই বিমানবন্দরে একাধিক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করেছে।
হুতিরা কেন সৌদি আরবকে আবার লক্ষ্যবস্তু করছে?
এই সংঘাতের শিকড় ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে। ২০১৪ সালে হুতি গোষ্ঠী ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরের বছর সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক অভিযানে নামে। এরপর বহু বছর ধরে যুদ্ধ, বিমান হামলা, অবরোধ এবং পাল্টা আক্রমণে দেশটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে সানার বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। হুতিদের অভিযোগ, সৌদি হামলায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিমানবন্দরের ক্ষতি হয়েছে। সৌদি-সমর্থিত পক্ষের বক্তব্য ছিল, ইরানের একটি উড়োজাহাজের অবতরণ ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এরপর হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবরোধ ও হামলার হুমকি দেয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
৪ অক্টোবর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার খবর আসতে থাকে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, হুতিরা কি কেবল প্রতিশোধ নিচ্ছে, নাকি সৌদি আরবকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে?
দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবকে সামরিকভাবে ব্যস্ত রাখতে পারলে দেশটির ইয়েমেন অভিযানের গতি কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে বিমান চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়ে সৌদি আরবের মিত্রদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র কি এবার সরাসরি যুদ্ধে নামবে?
এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সম্ভাবনা প্রকাশ করা এবং চূড়ান্তভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কয়েকটি পথ রয়েছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র সীমিত সামরিক অভিযান চালাতে পারে। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র, ড্রোন পরিচালনাব্যবস্থা, অস্ত্রের গুদাম এবং সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে সৌদি আরবের ওপর হামলার সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করা হতে পারে। এই পদক্ষেপ দ্রুত কার্যকর করা সম্ভব হলেও এর বড় ঝুঁকি হলো, হুতিরা পাল্টা হামলা বাড়াতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সামরিক হামলা চালালেই হুতিদের আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে -এমন নিশ্চয়তা নেই।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বড় আকারের হামলায় অংশ না নিয়েও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা বাড়াতে পারে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সামরিক পরিকল্পনায় সহযোগিতা জোরদার করা হলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ সংঘাত চলতে থাকলে সৌদি আরবের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক সরঞ্জামের মজুতের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে সরাসরি অংশ নিয়ে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এর ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হুতিদের পেছনে ইরানের সমর্থন থাকায় সংঘাতটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর বিরোধের সঙ্গেও আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু ইয়েমেন নয়, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর এবং আশপাশের সামরিক ঘাঁটিগুলোও নতুন করে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সীমিত সামরিক পদক্ষেপ এবং সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পথ। তবে নতুন হামলায় মার্কিন নাগরিক বা গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে।
ইরান কি সরাসরি যুদ্ধে না নেমেও চাপ বাড়াতে চাইছে?
হুতি গোষ্ঠী ইরান-সমর্থিত হলেও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে সরাসরি ইরানের নির্দেশে পরিচালিত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
তবে আঞ্চলিক সংঘাতে তাদের ভূমিকা ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুতিরা সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ালে ওয়াশিংটনকে একই সময়ে একাধিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে। এতে মার্কিন সামরিক শক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং কূটনৈতিক মনোযোগ বিভিন্ন দিকে ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের জন্য এটি সরাসরি সব ফ্রন্টে যুদ্ধ না করেও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধা হতে পারে। তবে রিয়াদে হামলার নির্দেশ ইরান দিয়েছে -এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হুতিদের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়, তাহলে ইরান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অর্থাৎ, হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত এখন আর কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বাব আল-মানদেব প্রণালি কেন গোটা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোর একটি লুকিয়ে আছে সমুদ্রপথে।
বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বহু বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং এই প্রণালির আশপাশে হুতিদের প্রভাব বাড়লে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। জাহাজে হামলার ঝুঁকি বাড়লে অনেক পরিবহন সংস্থা বিকল্প পথে চলতে বাধ্য হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হওয়ার খবর রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
এখন যদি হরমুজ ও বাব আল-মানদেব দুটি পথেই একসঙ্গে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারে, জাহাজের বিমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হতে পারে। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে বিভিন্ন পণ্যের দামেও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব পরিণতি অনিবার্য নয়। সংকটের মাত্রা নির্ভর করবে সমুদ্রপথ কত দিন ঝুঁকিপূর্ণ থাকে, কতগুলো জাহাজ চলাচল বন্ধ করে এবং বড় দেশগুলো কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় তার ওপর।
ইউরোপের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে স্পেনসহ ইউরোপের দেশগুলোতেও পণ্য পরিবহন ও জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের বিমান প্রতিরক্ষায় কি দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে?
এক সপ্তাহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে বারবার হামলার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সৌদি আরবের কাছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও রাজধানীর বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা ঠেকানো সম্ভব না হলে কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আক্রমণে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন শনাক্ত করতে কত সময় লেগেছে, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেগুলোকে মাঝপথে ধ্বংস করতে পেরেছে কি না এবং একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে হামলা হলে বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকে, এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি হামলার ঘটনা থেকেই সৌদি আরবের পুরো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে -এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। হামলার প্রকৃতি, প্রতিরোধের চেষ্টা এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
তবু বারবার হামলা হওয়ার অর্থ হলো, শুধু প্রতিশোধমূলক বিমান হামলা চালিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। হামলার উৎস শনাক্ত করা, গোয়েন্দা তথ্য উন্নত করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা বাড়ানো এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও কি যুদ্ধবিরোধী চাপ বাড়বে?
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সামরিক সিদ্ধান্তটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত।
আপনার দেওয়া টাইম সাময়িকীর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ অক্টোবরের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হয়নি।
এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, নতুন একটি সামরিক অভিযান শুরু করলে ট্রাম্প প্রশাসনকে জনমতের বিরোধিতাও বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘ যুদ্ধের ব্যয়, মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা, অস্ত্রের মজুত এবং জ্বালানির দাম -সবই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হতে পারে।
তবে জনমত যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকলেই যে সরকার সামরিক পদক্ষেপ নেবে না, তা নয়। মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা বা মিত্র দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় হামলা হলে প্রশাসনের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার চাপও বাড়তে পারে।
সুতরাং ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে দুটি বিপরীত চাপের ওপর: একদিকে সৌদি আরবকে রক্ষা করা ও প্রতিপক্ষকে কঠোর বার্তা দেওয়া, অন্যদিকে নতুন একটি দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলা।
বাংলাদেশিদের জন্য কেন এই সংকট বিশেষ উদ্বেগের?
রিয়াদের হামলায় দুজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা জরুরি।
তবে সব প্রবাসী কর্মী সরাসরি একই মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছেন, এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করবে তাঁদের অবস্থান, কর্মস্থল, চলাচলের প্রয়োজন এবং স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের উচিত বিমানবন্দর বা নিরাপত্তা বাহিনীর নির্ধারিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলা এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ দূতাবাস ও সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র হাতের কাছে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ বা হামলাস্থলের ছবি-ভিডিও প্রকাশের আগে স্থানীয় আইন ও নিরাপত্তা নির্দেশনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশি নিহতদের পরিচয়, মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহতদের চিকিৎসা সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত।
এরপর কী হতে পারে? তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট
প্রথম সম্ভাবনা হলো সীমিত পাল্টা হামলা। সৌদি আরব হুতিদের সামরিক স্থাপনায় হামলা বাড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ও আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা জোরদার করতে পারে। এতে সংঘাত বাড়লেও বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কিছুটা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ। নতুন হামলা হলে বা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আবার আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিমান হামলা শুরু করতে পারে। এতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে।
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত। সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর বিরোধ আরও তীব্র হলে এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল ও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তায়।
এ মুহূর্তে কোন দৃশ্যপট বাস্তব হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্ত, হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে।
বিমানবন্দরে এই হামলা কি আরও বড় যুদ্ধের সংকেত?
রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি কঠিন পরীক্ষা। ওয়াশিংটনকে ঠিক করতে হবে, সৌদি আরবকে কতটা সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে এবং হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া কতটা প্রয়োজনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ।
এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, একটি পক্ষের পাল্টা হামলা অন্য পক্ষকে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে। তখন সংঘাতের পরিধি শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তবে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হবেই, -এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া এবং হুতিদের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় যুদ্ধের দিকে এগোবে, নাকি সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকবে।
| তথ্যসূত্র: টাইম, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, ডয়চে ভেলে ও আল-জাজিরা।










