দ্যা ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন
বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার মুছে ফেলা হচ্ছে
রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ৭ মার্চ ১৯৭১) এক বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ছবি: সংগৃহীত
জাতি গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা অনেক কিছুর পাশাপাশি এমন একজন নায়কের প্রয়োজন, যাকে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী গ্রহণ করে। উপনিবেশ-পরবর্তী দেশগুলোতে সাধারণত সেই নায়ক হলেন তিনি, যিনি দেশকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন করেছিলেন।
একটি দেশের নায়ক, যেহেতু মানুষ, তাই নিখুঁত হতে পারেন না। গণতন্ত্রে তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সমালোচিত হয়। কিন্তু স্বৈরতন্ত্রে একজন শাসক প্রায়ই জাতীয় নায়কের ভাবমূর্তি ব্যবহার করেন বা চাপিয়ে দেন তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসে কোনো গুরুতর বিতর্কের সুযোগ দেন না।
এমন এক নায়ক হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। মুজিবের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর নেতৃত্বের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই বছর মুজিবের (১৯২০-১৯৭৫) মৃত্যুর ৫০তম বার্ষিকী। তিনি ও তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনা কর্মকর্তাদের হাতে নিহত হন, যারা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। ১৯৭৫-এর পর সামরিক শাসন, সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আমলে মুক্তিযুদ্ধের অন্য বর্ণনা সামনে আসে। এই সময়ে ইসলামপন্থীরাও রাজনৈতিক ভিত্তি অর্জন করে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুজিবের নেতৃত্ব কতটা গণতান্ত্রিক ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর সরকার গঠন করে জাতীয় রক্ষীবাহিনী, যারা মূলত রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালায়। তাঁর সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করে, যা একদলীয় শাসন ও সর্বময় ক্ষমতার পথ সুগম করে। ১৯৭৫ সালের এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে অন্য সব রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং একই বছরের জুনে বেশিরভাগ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে (১৯৯৬-২০০১, এবং ২০০৯-২০২৪) মুজিব দেশের কল্পনায় কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। হাসিনা মুজিবের কন্যা। তিনি ও তাঁর বোন রেহানা ছিলেন পরিবারের একমাত্র সদস্য, যারা ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যান।
২০২৪ সালে হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হলে মুজিবের ঐতিহ্যও আক্রমণের শিকার হয়। বিক্ষোভকারীরা ভাঙচুর ও আগুন দেয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুরাল, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত থেমিসের ভাস্কর্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ভাস্কর্য (ময়মনসিংহ), মেহেরপুরে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থাপিত মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্যে। এছাড়া ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামেও ব্যাপক ভাঙচুর হয়।
ছয় মাস পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হাসিনা যখন ভারত থেকে অনলাইনে ভাষণ দিয়ে তাঁর সমর্থকদের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আহ্বান জানান, তখন বিক্ষোভকারীরা—যাদের অনেকে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল—ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের মুজিবের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাবনা, চুয়াডাঙ্গা ও রংপুরেও বিক্ষোভকারীরা মুজিবের মুরাল ভাঙচুর করে এবং জেলা আওয়ামী লীগ অফিস, দলীয় নেতাদের মূর্তি ও প্রতিকৃতি আক্রমণ করে।
আগস্টে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা নতুন দলের নেতা, নাহিদ ইসলাম ফেসবুকে লিখেন—“তাঁর (মুজিবের) নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারত-নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, জনগণ-বিরোধী ১৯৭২ সালের সংবিধান চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর লুটপাট, রাজনৈতিক হত্যা ও একদলীয় বাকশাল স্বৈরশাসনের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।”
প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার সূচনা হয় তরুণ শিক্ষার্থীদের মন গঠনের মাধ্যমে। হাসিনা-পরবর্তী সময়ে, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন কল্পনা তৈরির চেষ্টা করে। তারা পূর্বের পাঠ্যবই সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। এই সংশোধনের লক্ষ্য ছিল, কমিটির সদস্য রাখাল রাহার ভাষায়, শিক্ষার্থীদের “অতিরঞ্জিত, চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাস” থেকে মুক্ত করা।
২০২৫ সালের জন্য প্রণীত সংশোধিত পাঠ্যবই “বাংলাদেশ ও বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস নবম ও দশম শ্রেণি”-তে মুজিবের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা যথেষ্ট পরিমাণে আলোচনা করা হয়েছে। বইয়ের ২০২ পৃষ্ঠায় মুজিবের বিখ্যাত মার্চ ১৯৭১-এর ভাষণের উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনি জনগণকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের আহ্বান জানান। সেই ভাষণে মুজিব বলেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
বইয়ের ২০৪ পৃষ্ঠায় লেখা আছে: “মেজর জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর তিনি ২৭ মার্চ আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে।”
তবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরক্তির কারণ হলো, বইটিতে মুজিবকে “জাতির পিতা” বলা হয়নি। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই বছরের জুনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২২ সালের সেই আইনটি পরিবর্তন করে, যেখানে তাঁকে জাতির পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
জাতীয় নায়ক ও প্রতীক শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, অনেক সময় এগুলো রাজনৈতিকভাবে তৈরি হয় নির্দিষ্ট ইতিহাসকে তুলে ধরতে, ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা, উচ্চাশা ও প্রত্যাশা বহন করতে। তাই জাতীয় প্রতীক পরিবর্তিত হয় জাতির মেজাজ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রায়ই সহিংস ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারণে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুজিবের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। হাসিনার স্বৈরশাসন বৈধতা দিতে মুজিবের ব্যক্তিত্ব ব্যবহার করার প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সময়ে মুজিববিরোধী শক্তি ভুল তথ্য ও ইতিহাস বিকৃতি ব্যবহার করে তাঁর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
(দ্য ডিপ্লোম্যাট পত্রিকা থেকে অনুবাদকৃত)










