জার্মানি
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে জার্মানিতে বিক্ষোভ, সন্ধ্যার পর সহিংসতা ও দোকানপাটে লুটপাট
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের পর একাধিক দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। শনিবার রাতের সহিংসতায় শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
জার্মানির বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার পরিকল্পনার প্রতিবাদে শনিবার (৩১ অক্টোবর) বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। দিনের বেলায় অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ, বার্লিন ও কোলনসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং বহু মানুষকে আটক করে।
‘জেন জেড রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি তরুণদের উদ্যোগের ডাকে জার্মানির ৩০টিরও বেশি শহরে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের দাবি, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক ন্যায়বিচার, জলবায়ু সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল কর্মসূচির উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর বিরোধিতাও ছিল বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান দাবি।
ফ্রাঙ্কফুর্টে দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট
শনিবার রাতের সবচেয়ে গুরুতর সহিংসতার ঘটনা ঘটে জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম হেসেনশাউয়ের (hessenschau) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনের বেলায় অধিকাংশ সময় শান্তিপূর্ণ থাকা বিক্ষোভ পুলিশ শেষ করে দেওয়ার পর শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মুখোশধারী কয়েকটি দল দোকানের কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে জুতা ও অন্যান্য পণ্য লুট করে। অস্ত্র বিক্রির একটি দোকানেও হামলা চালানো হয়। পুলিশ জানায়, ওই দোকান থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়।

শহরের প্রধান বাণিজ্যিক সড়ক জাইল (Zeil), হাউপ্টভাখে ও কনস্টাবলারভাখে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এলাকা ঘিরে ফেলে এবং জলকামান ও বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করে। পুলিশের দিকে পটকা, আতশবাজি, পাথর ও বোতল ছোড়ার ঘটনাও ঘটে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল নিক্ষেপের খবর দিয়েছে পুলিশ।
হেসেনশাউয়ের রাতের প্রতিবেদনে শহরের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, দোকানের কাচ ভাঙা এবং লুটপাটের কথা বলা হয়। জার্মানির জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এআরডির সংবাদ বিভাগ টাগেশশাউও (tagesschau) জানায়, ফ্রাঙ্কফুর্টে বেশ কয়েকটি দোকান লুট হয়েছে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একাধিক কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
হামবুর্গে ব্যারিকেডে আগুন, ১২০ জন আটক
উত্তর জার্মানির হামবুর্গে দিনের বেলার বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও সন্ধ্যায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিআর (NDR) জানায়, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় জুংফার্নস্টিগ থেকে শুরু হওয়া মিছিলের পর পুলিশ বিকেল ৫টার দিকে কর্মসূচি শেষ ঘোষণা করে।
এরপর সেন্ট জর্জ এলাকার স্টেইনডাম সড়কে কালো পোশাক পরা ও মুখ ঢাকা কয়েকটি দল পুলিশের দিকে পাথর, বোতল ও পটকা ছোড়ে। নির্মাণকাজের জায়গা থেকে ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তায় এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আবর্জনার পাত্রেও আগুন লাগানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ব্যবহার করে।

এনডিআরের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামবুর্গে মোট ১২০ জনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। শহরের পূর্বাঞ্চলের হামেরব্রুক ও বিলস্টেড এলাকায় গাড়ি ও কাগজের আবর্জনার পাত্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
বার্লিনে ২৭ পুলিশ কর্মকর্তা আহত
রাজধানী বার্লিনেও বিক্ষোভ-পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের কাছে মূল বিক্ষোভ কর্মসূচি প্রায় নির্বিঘ্নে শেষ হয়। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে জড়ো হয়েছিলেন।
অন্যদিকে, সন্ধ্যায় মিটে এলাকায় রোজেনথালার প্লাৎসকে কেন্দ্র করে পৃথক জমায়েতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একাংশ পাথর, বোতল, ডিম ও আতশবাজি ছোড়ে। এতে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা সামান্য আহত হন। পুলিশ ৫৬ জনকে সাময়িকভাবে আটক করে। ভাঙচুর, শারীরিক হামলা এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।
কোলনেও জলকামান, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
পশ্চিম জার্মানির কোলন শহরেও বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডব্লিউডিআর (WDR) জানায়, বিক্ষোভ মিছিলের কিছু অংশে আতশবাজি ব্যবহার এবং কয়েকজনের মুখ ঢেকে রাখার কারণে পুলিশ নির্ধারিত মিছিল বাতিল করে। সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার সময় সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।
টাগেশশাউয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোলনের ক্যাথেড্রাল ও প্রধান রেলস্টেশনের আশপাশেও পুলিশের সঙ্গে ছোট ছোট দলের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় অন্তত পাঁচজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি কী?
‘জেন জেড রেগেল্ট’ উদ্যোগের মূল বক্তব্য, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। জার্মানির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট, স্বাস্থ্যসেবার চাপ, সামাজিক সেবায় কাটছাঁট এবং বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বার্লিনে বলেন, তারা যুদ্ধ ও জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও সহায়তা এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন চান তারা।
আয়োজকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিন মিলিয়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ প্রায় ১৮ হাজার। আয়োজকদের দাবি ছিল প্রায় ৩৬ হাজার। রয়টার্স জানিয়েছে, দেশজুড়ে ৩৪টি শহরে কর্মসূচি হলেও আয়োজকদের প্রাথমিক প্রত্যাশা অনুযায়ী অংশগ্রহণ হয়নি।
আয়োজকদের সহিংসতা থেকে দূরত্ব
দিনের বেলার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পর রাতের সহিংসতার ঘটনায় ‘জেন জেড রেগেল্ট’ উদ্যোগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আয়োজকেরা সহিংসতার দায় অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন এবং কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর সংঘটিত ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক অভিযোগ করেছেন, বামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীর প্রায় ১০০ সদস্য ফ্রাঙ্কফুর্টের বিক্ষোভে মিশে গিয়ে সহিংসতা উসকে দিয়েছে। তবে রাতের সহিংসতায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তাধীন।
জার্মানির জাতীয় স্কুল শিক্ষার্থী সংগঠনও ‘জেন জেড রেগেল্ট’ উদ্যোগ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব সম্পর্কে স্পষ্টতা না থাকায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যুক্ত নয়। আগামী ২০ নভেম্বর শিক্ষার্থীদের আলাদা কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
জার্মানির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল প্রবৃদ্ধির মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে পেনশন ও জনসেবা খাতে ব্যয় বাড়ছে এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে আসছে। এই পরিস্থিতিতে তরুণদের ভবিষ্যৎ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি বিনিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
শনিবারের ঘটনাগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের উদ্বেগ বড় পরিসরে প্রকাশ পেলেও, বিক্ষোভের পর সহিংসতা ও লুটপাট আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে আড়াল করে দিয়েছে। পুলিশ বিভিন্ন শহরের ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
| তথ্যসূত্র:** হেসেনশাউ, এনডিআর, ডব্লিউডিআর, টাগেশশাউ, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আনাদোলু এজেন্সি










