অকৃতজ্ঞ না হয়ে বরং গণভোটে হ্যাঁ দিয়ে হাদির পথ বেছে নাও
তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশকে পুনর্জাগরণের পথে নিয়ে এসেছে। এই সত্যটি অনেক প্রবীণ আজও স্বীকার করতে দ্বিধা করছেন। কেন জানেন? অকৃতজ্ঞতা। অথচ ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে, অকৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে।
আমাদের অতীতে তাকালেই দেখা যায়, এই অকৃতজ্ঞতার কারণেই আমরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হারিয়েছিলাম। ১৭৫৬ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। তার নানা নবাব আলীবর্দী খান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিষয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, সুযোগ পেলেই তারা এই দেশ দখল করবে, এই সতর্কতা তিনি উপেক্ষা করেননি। তবুও ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফর ও রায়দুর্লভের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। এর পর রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার দখল করে নেয়। সেখান থেকেই আমাদের দীর্ঘ পরাধীনতার যাত্রা শুরু হয়।
এই ইতিহাস জানা সত্ত্বেও আজ আবার আমরা একই ভুলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে তরুণ প্রজন্ম অনেক প্রবীণের জীবন ও সম্মান রক্ষা করেছে, সেই প্রজন্মের সঙ্গেই আজ নতুন করে বেঈমানি করার চেষ্টা চলছে। এটি শুধু রাজনৈতিক ভুল নয়, এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা।
এবারের আসন্ন নির্বাচনে যদি গণভোটে হ্যাঁ ভোট না পড়ে, আর যারা জেনেশুনে এই বেঈমানির পথে হাঁটবে, তাদের অপকর্মের দায় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি নিজের ঘাড়ে নিতে পারি না। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে দেশের সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করার দুঃসাহস বাংলার মাটিতে আবার দেখা যাবে, এই ভাবনাতেই গা শিউরে ওঠে। এটি ঘৃণ্য, এটি জঘন্য। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, প্রতিবারই এই বেঈমানির মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
নতুন প্রজন্মকে আবারও বলতে চাই, হাদির মৃত্যু থেকে কি তোমরা কিছুই শেখোনি? একজন মানুষের বিদায়ে গোটা বিশ্ব কেঁদেছে, কারণ তিনি নিজের জন্য নয়, তার মাতৃভূমির জন্য দাঁড়িয়েছিলেন। এমন মৃত্যু ইতিহাসে বিরল, কিন্তু চিরস্মরণীয়। এটি কোনো আবেগের গল্প নয়, এটি একটি জাতির বিবেকের প্রশ্ন।
যখন তুমি এসেছিলে ভবে, কেঁদেছিলে তুমি, হেসেছিলো সবে।
এমন জীবন তুমি করিও গঠন, মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে আর কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করেছে, বর্তমান আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে, আর ভবিষ্যৎ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তরুণ প্রজন্ম একবার প্রমাণ করেছে তারা শুধু প্রতিবাদ করতে জানে না, প্রয়োজনে জীবন দিয়েও দায়িত্ব নেয়। সেই দায়কে অস্বীকার করা মানে পুরো দেশের সঙ্গে বেঈমানি করা।
দেশ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। দেশ মানে মানুষ, রক্ত, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ। যখন আমরা গণভোটে না ভোট দিই, যখন আমরা জেনেশুনে অন্যায়কে মেনে নিই, তখন আমরা নীরবভাবে সেই ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দিই।
এখন সিদ্ধান্তের সময়। আমরা কি ইতিহাসের পাশে দাঁড়াব, না কি বেঈমানির সারিতে নাম লেখাব। উত্তর কঠিন নয়।
মানুষ থাকলে দেশ বাঁচে। বিবেক থাকলে ইতিহাস বদলায়। আর দায়িত্ব নিলে ভবিষ্যৎ সম্ভব হয়। দল নয়, যোগ্য এবং সৎ ব্যক্তিকে ভোট দিন এবং গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিন।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন, [email protected]










