স্পেন
স্পেনের জাতীয় দিবস কেন ১২ অক্টোবর, কলম্বাসের ঐতিহাসিক অভিযানের নেপথ্যে কী ছিলো?
১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর বাহামা দ্বীপপুঞ্জে ক্রিস্তোবাল কোলোনের (Cristóbal Colón) পৌঁছানোর দৃশ্য এই চিত্রকর্মে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি মার্কিন চিত্রশিল্পী জন ভ্যান্ডারলিন (John Vanderlyn) ১৮৪৭ সালে আঁকেন।
অনেকেই জানেন, ১২ অক্টোবর স্পেনের জাতীয় দিবস। তবে কেন এই দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়? এর পেছনে ইতিহাস কী এবং কীভাবে স্পেনের এক রাজা ও রানির পৃষ্ঠপোষকতায় ইতালীয় নাবিক ক্রিস্তোবাল কোলোন আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছেছিলেন, তা অনেকেরই অজানা।
স্প্যানিশ ভাষায় দিনটি পরিচিত ফিয়েস্তা নাসিওনাল দে এস্পানিয়া (Fiesta Nacional de España) নামে। এদিন স্পেনজুড়ে সরকারি ছুটি থাকে। রাজধানী মাদ্রিদে (Madrid) আয়োজন করা হয় সামরিক কুচকাওয়াজসহ নানা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান।
১২ অক্টোবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৪৯২ সালের একটি ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রা, স্পেনের রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ইউরোপের বাইরে স্পেনের প্রভাব বিস্তারের সূচনা। একই সঙ্গে এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও উপনিবেশবাদের বেদনাদায়ক অধ্যায়।
কলম্বাস কে ছিলেন, কেন তিনি সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন?
ক্রিস্তোবাল কোলোন (Cristóbal Colón), যিনি ইংরেজিতে ক্রিস্টোফার কলম্বাস (Christopher Columbus) নামে পরিচিত, ছিলেন ইতালির জেনোয়া অঞ্চলের একজন নাবিক ও অভিযাত্রী। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা এশিয়ার মসলা ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের বাজারে পৌঁছানোর নতুন সমুদ্রপথ খুঁজছিলেন। প্রচলিত পথের বিকল্প হিসেবে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে এশিয়ায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেন কলম্বাস।
তাঁর ধারণা ছিল, পশ্চিম দিকে সমুদ্রপথে যাত্রা করলে এশিয়ায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। কিন্তু সেই সময়ের ভৌগোলিক জ্ঞান অনুযায়ী পৃথিবীর আকার ও এশিয়ার দূরত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণায় ভুল ছিল। প্রথমে পর্তুগালের রাজা তাঁর পরিকল্পনায় সম্মতি দেননি। পরে কলম্বাস স্পেনের রাজদরবারে নিজের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
কোন রাজা ও রানির পৃষ্ঠপোষকতায় আমেরিকা অভিযান?
কলম্বাসের অভিযানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল স্পেনের দুই শাসকের। তাঁরা হলেন কাস্তিয়া রাজ্যের রানি প্রথম ইসাবেলা (Isabel I de Castilla) এবং আরাগন রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ (Fernando II de Aragón)। ইতিহাসে তাঁরা লস রেয়েস কাতোলিকোস (Los Reyes Católicos), অর্থাৎ ‘ক্যাথলিক রাজা ও রানি’ নামে পরিচিত।

কলম্বাস ১৪৮৬ সালে তাঁদের কাছে নিজের সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। কয়েক বছর আলোচনা ও দরবারি বিবেচনার পর ১৪৯২ সালের ১৭ এপ্রিল গ্রানাডার সান্তা ফে শহরে তাঁর সঙ্গে রাজদরবারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি কাপিতুলাসিওনেস দে সান্তা ফে (Capitulaciones de Santa Fe) নামে পরিচিত।
এই চুক্তির মাধ্যমে কলম্বাসের অভিযানের পরিকল্পনা অনুমোদন পায়। অভিযানে নতুন ভূখণ্ড পাওয়া গেলে তাঁকে বিভিন্ন পদ ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। রানী ইসাবেলার সমর্থন ও রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা এই সমুদ্রযাত্রাকে বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্পেনের রাজা ও রানির এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু ভৌগোলিক অনুসন্ধানের আগ্রহ ছিল না। এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, মূল্যবান পণ্যের নতুন উৎস খুঁজে পাওয়া এবং স্পেনের রাজশক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট যাত্রা, ১২ অক্টোবর নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছানো
১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট কলম্বাস স্পেনের পালোস দে লা ফ্রন্তেরা (Palos de la Frontera) বন্দর থেকে তিনটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। জাহাজ তিনটির নাম ছিল সান্তা মারিয়া (Santa María), পিন্তা (Pinta) ও নিনিয়া (Niña)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নাবিক ও অন্যান্য অভিযাত্রী।
আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে প্রায় দশ সপ্তাহের সমুদ্রযাত্রার পর ১২ অক্টোবর অভিযানের সদস্যরা ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপের দেখা পান। দ্বীপটি ছিল বর্তমান বাহামা দ্বীপপুঞ্জের অংশ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে দ্বীপটি গুয়ানাহানি (Guanahaní) নামে পরিচিত ছিল। কলম্বাস এর নাম দেন সান সালভাদর (San Salvador)।
কলম্বাস ভেবেছিলেন, তিনি এশিয়ার কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে পৌঁছেছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি ইউরোপীয়দের কাছে আগে অজানা থাকা আমেরিকা মহাদেশের ভূখণ্ডে পৌঁছেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর আরও সমুদ্রযাত্রা হয় এবং ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার যোগাযোগ ও স্পেনের উপনিবেশ বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়।
এই ঘটনাকেই স্পেনে প্রচলিতভাবে ‘আমেরিকা আবিষ্কার’ বলা হয়। তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, কলম্বাসের আগমনের বহু আগে থেকেই আমেরিকা মহাদেশে বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তাঁদের নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা ও সভ্যতা ছিল। তাই আদিবাসীদের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি নতুন কোনো জনবসতিপূর্ণ ভূখণ্ড আবিষ্কার নয়, বরং ইউরোপীয়দের আগমন ও পরবর্তী উপনিবেশ বিস্তারের সূচনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কলম্বাসের অভিযানের পর কী পরিবর্তন ঘটে?
কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার পর স্পেন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও উপনিবেশ বিস্তার করতে শুরু করে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দখলদারত্ব, সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম, রোগের বিস্তার এবং ভূমি ও সম্পদ হারানোর মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটে।

বর্তমানে লাতিন আমেরিকার বহু দেশে স্প্যানিশ ভাষা প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব দেশের সঙ্গে স্পেনের ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্ম ও ইতিহাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই সম্পর্কের ইতিহাস একদিকে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও ভাষার বিস্তার, অন্যদিকে উপনিবেশবাদ ও আদিবাসীদের ওপর নিপীড়নের ইতিহাসও বহন করে।
কেন ১২ অক্টোবর স্পেনের জাতীয় দিবস?
১২ অক্টোবরের রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব এক দিনে তৈরি হয়নি। ১৮৯২ সালে কলম্বাসের প্রথম সমুদ্রযাত্রার চারশ বছর পূর্তির সময় দিনটি বিশেষভাবে উদ্যাপিত হয়। ১৯১৮ সালে স্পেনে দিনটি সরকারি ছুটির স্বীকৃতি পায়। পরবর্তী সময়ে এটি স্পেনের জাতীয় পরিচয় ও স্প্যানিশ ভাষাভাষী বিশ্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৮৭ সালের ৭ অক্টোবর স্পেনের আইন ১৮/১৯৮৭ (Ley 18/1987) অনুযায়ী ১২ অক্টোবরকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের জাতীয় দিবস ঘোষণা করা হয়। আইনে দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউরোপের বাইরেও স্পেনের ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তারের সূচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দিনটি দিয়া দে লা হিস্পানিদাদ (Día de la Hispanidad) নামেও পরিচিত। এই নামের মাধ্যমে স্পেন ও স্প্যানিশ ভাষাভাষী বিশ্বের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়।
কীভাবে পালিত হয় জাতীয় দিবস?
প্রতি বছর ১২ অক্টোবর জাতীয় দিবসের প্রধান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয় মাদ্রিদে। রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ (Felipe VI), রাজপরিবারের সদস্য, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশ। এসব আয়োজন টেলিভিশনেও সম্প্রচার করা হয়।
একই দিনে আরাগন (Aragón) অঞ্চলের রাজধানী সারাগোসায় (Zaragoza) ভিরখেন দেল পিলার (Virgen del Pilar) উপলক্ষে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এটি ওই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক আয়োজন।
কলম্বাসের অভিযান স্পেনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল। স্পেনের রাজা ও রানির পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া সেই সমুদ্রযাত্রা পরবর্তী সময়ে বিশ্ব ইতিহাস, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তারে বড় প্রভাব ফেলে। তবে ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে ইউরোপীয় অভিযানের পাশাপাশি আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও তাঁদের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের কথাও মনে রাখা প্রয়োজন।
১২ অক্টোবর তাই স্পেনের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সমুদ্রযাত্রা, বিশ্ব ইতিহাসের পরিবর্তন এবং এমন এক অতীত, যার প্রভাব আজও স্পেন ও লাতিন আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে দেখা যায়।
| তথ্যসূত্র: স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্পেনের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, স্পেনের সরকারি আইনভান্ডার।













