একদিনে সাতজনের মৃত্যু, ফের অশান্ত ভারতের মণিপুর
ভারতের মণিপুরে আবারও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যটিতে প্রাণহানির পাশাপাশি পুলিশ স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও একাধিক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ। বিজেপির এই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
মণিপুরে হতাহতের প্রথম ঘটনা ঘটে শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ কুকি গ্রামে। সেখানে ৪২ বছর বয়সী এক কুকি নারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এরপর নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়, যা শনিবার সকাল পর্যন্ত চলে। এ সংঘর্ষে ২২ বছর বয়সী এক যুবকও নিহত হন।
এ ছাড়া নিংচৌ গ্রামে কুকি ন্যাশনাল আর্মি-বার্মা এবং ভিলেজ ভলান্টিয়ার অব ইস্টার্ন জোনের সমন্বিত হামলায় দুই নাগা নিহত হন। নাগা সিভিল ডিফেন্সের দুই স্বেচ্ছাসেবক গুলিবিদ্ধ হন। শনিবার সকালে নিংচৌ গ্রামে সন্দেহভাজন জঙ্গি হামলায় আরও দুই নাগা ব্যক্তির মৃত্যু হয়। উখরুল জেলায় সন্দেহভাজন জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান ৪০ বছর বয়সী এক নেপালি ব্যক্তি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কামজং জেলা প্রশাসন পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, অস্ত্র বহন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে, কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি কাংপোকপি জেলায় ২৪ ঘণ্টার বন্ধের ডাক দিয়েছে।
কুকি নারী হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কুকি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এবং দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের কুকি-জো উইমেন্স ফোরাম। তারা ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিহত নারীর পাঁচ সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে।
মণিপুরের পরিস্থিতিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ। তিনি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত আরও শক্তভাবে সুরক্ষিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক এই সহিংসতাকে গত এক বছরের মধ্যে মণিপুরের অন্যতম প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি রাজ্য কর্তৃপক্ষ। নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন মণিপুর এবং মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছে।
সম্প্রতি মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিংহ দিল্লি সফরে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে রাজ্যের পরিস্থিতি এবং পুনর্বাসন, যাত্রীবাহী বাস পরিষেবা চালু ও আর্থিক সহায়তাসহ শান্তি ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় তিনি অমিত শাহকে মণিপুর সফরের আমন্ত্রণ জানান। শাহ অক্টোবরে রাজ্যটি সফরের কথা জানান। তবে মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি সফর শেষে ফেরার পর থেকে রাজ্যে অশান্তি বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মণিপুরে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজ্য সরকারকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার নয়াদিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী ইউনাম খেমচাঁদ সিংহের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ৭ লোক কল্যাণ মার্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি ইমফল-দিমাপুর-গুয়াহাটি বাস পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়া এবং ইম্ফল-শিলচর ও ইমফল-ডিমাপুর সড়ক দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাকের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেন।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার সংকট দূর করতে রাজ্য সরকারের চলমান উদ্যোগ সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে জানান মুখ্যমন্ত্রী। এ সময় কয়েকটি রাজ্য সড়ককে জাতীয় সড়কে উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদনের অনুরোধ জানান তিনি। পাশাপাশি, ইমফলের আঞ্চলিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটকে (রিমস) সর্বভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের (এআইআইএমএস) মর্যাদা দেওয়ার দাবিও উত্থাপন করেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে মণিপুর সফরের আমন্ত্রণ জানান খেমচাঁদ সিংহ। রাজ্যে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, মণিপুরের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। রাজ্যের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা সমাধানে কেন্দ্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।










