বিশেষ সম্পাদকীয়
ঈদের আনন্দ যাত্রা যখন মরণযাত্রায় পরিণত হয়
ঈদ মানে আনন্দ, মিলন, হাসি‑কান্না, দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি দূর করে নিজের পরিবারের সাথে সুন্দর ও আনন্দঘণ সময় পার করার মুহূর্ত। অথচ, ঈদের আনন্দ যাত্রার শেষ পরিণতি, অনেক পরিবারের জন্য আজীবনের কান্না হয়ে ওঠছে। কিন্তু এই আনন্দময় সময়ে সড়কের, নদীর ও রেলের অনিয়ন্ত্রিত যাত্রা কত অসহায় মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তা আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত দুঃসহ চিত্র হিসেবে ফুটে ওঠে। গত এক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার যাত্রীরা দেশের বিভিন্ন জেলার বাড়ি ফিরতে গিয়ে অগণিত দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
ঢাকা থেকে শুরু হওয়া ঈদযাত্রায় মাত্র সাত দিনে দেশের ২৬৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন প্রাণ হারিয়েছে, আহত হয়েছেন আরও শতাধিক। নৌপথে ঘটেছে একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ১৮ মার্চ বিকেলে সদরঘাটে এমভি জাকির সম্রাট-৩ ও অন্যান্য লঞ্চের মধ্যে ট্রলারের সংঘর্ষে পিষ্ট হয়েছে বাবা ও ছেলে, আহত হয়েছেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। আর ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত ও নিখোঁজ আরও অনেকে। এমন ঘটনায় অনেকে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে মিলনের আনন্দই হারিয়ে ফেলেন, আর সন্তান, বাবা-মা, স্বজনদের জন্য প্রত্যেক মুহূর্তই হয়ে ওঠে দীর্ঘ কান্নার গল্প।
এই ভয়াবহতার পেছনে দায়ী শুধু দুর্ঘটনা নয়। সরকারের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ঘাটতি এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়। ঢাকা থেকে দেশের বাড়ি যাত্রার জন্য নির্বাহী আদেশে ছুটি বাড়ানো, অস্থায়ী টার্মিনাল তৈরি, লঞ্চ ও বাস চলাচলে নিয়ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নজরদারি হয়নি। সড়ক, নৌ ও রেল—তিন বিভাগের দুর্ঘটনা বারবার প্রমাণ করে যে, পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে।
অতিরিক্ত গতিবেগ, নিয়ন্ত্রণ হারানো, অপরিকল্পিত যান চলাচল, সার্ভিসবিহীন গাড়ি বা ট্রলার—এসবই মৃত্যুর সরাসরি কারণ। কিন্তু এই সমস্যাগুলো দূর করতে সরকারের কার্যকর নজরদারি ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপই মূল চাবিকাঠি। শুধু দুর্ঘটনার পর ত্রাণ বা উদ্ধারকাজে নির্ভর করে কোনো সমাধান হবে না।
ঈদের আনন্দের সড়ক, নদী বা রেলপথ অনেকের জন্য পরিণত হয়েছে সারাজীবনের কান্নার স্রোতে। অগণিত পরিবারকে ছেঁড়ে দিয়ে, স্বপ্ন, আশা আর জীবনের মূল্যহীন হয়ে যাওয়ার গল্প লিখেছে। সরকারের দায়িত্ব হলো—প্রতিটি যাত্রাপথকে নিরাপদ করা, নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার করা। নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ ছাড়া আনন্দ কোনোদিনই নিরাপদ হয়ে ওঠে না।
ঈদ মানে কেবল মিলন নয়, তা হলো সুরক্ষা, নিরাপদ যাত্রা এবং জীবনের অমূল্য রক্ষা। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ফেরার প্রতিটি মানুষই প্রকৃত ঈদ উপলব্ধি করতে পারে। আর যদি সরকার এই দায়িত্ব থেকে অবহেলা করে, তবে ঈদের আনন্দের পেছনে লুকিয়ে থাকে শুধু শোক ও অনিশ্চয়তা। ঈদ উদযাপন আনন্দঘন হওয়া উচিত। ঈদ করতে যাওয়া ও ফিরতি আসার পথে কোনো মানুষের জীবনের অধ্যায় যেন থেমে না যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় জীবনহানি হয়ে কেউ তার পরিবারের স্মৃতিতে কালো অধ্যায় হয়ে থেকে না যায়।










