বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণ ২১ ট্রিলিয়ন (২১ লাখ কোটি) টাকা ছাড়িয়েছে
বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণ প্রথমবারের মতো ২১ ট্রিলিয়ন (২১ লাখ কোটি) টাকার সীমা পেরিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজস্ব ঘাটতি ও বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের চাপ বাড়ায় সরকারি ঋণ ক্রমেই উর্ধ্বমুখী হয়েছে। অর্থ বিভাগের সদ্য প্রকাশিত ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারের মোট দায় দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৮৯ ট্রিলিয়ন।
বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের চিত্র:
বুলেটিনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণ এখন ৯ দশমিক ৪৯ ট্রিলিয়ন টাকা—মোট ঋণের ৪৪ শতাংশেরও বেশি। গত পাঁচ বছরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে; ২০২১ সালে যেখানে ছিল ৪ দশমিক ২০ ট্রিলিয়ন টাকা।
অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণও বেড়ে ১১ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ৭ দশমিক ২২ ট্রিলিয়ন।
কেন ঋণ বাড়ছে:
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মহামারির পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাজেট সহায়তা এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় ঋণ দ্রুত বাড়ছে।
নীতিগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই ঊর্ধ্বমুখী ঋণ প্রবণতা বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, দুর্বল রাজস্ব আদায়ের কারণে সরকার উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য স্থানীয় ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকেই ধার নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে ঋণের চাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে দেশীয় ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়া এবং বিদেশি ঋণের কঠোর শর্ত—যেমন কম গ্রেস পিরিয়ড, বেশি সুদ ও দ্রুত পরিশোধের সময়সীমা—পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
সুদের বোঝা দ্রুত বাড়ছে:
গত অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা—যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ ২১ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধ এক বছরে ৪৩ শতাংশ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কতা:
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশই সবচেয়ে দ্রুতগতির দেশের তালিকায় শীর্ষে। গত ১৩ বছরে সরকারি ও গ্যারান্টিযুক্ত বৈদেশিক ঋণ তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, বিদেশি ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এই অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের সীমা বেধে দেওয়া হয়েছে। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এই সীমা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
আইএমএফের ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে (DSA) বাংলাদেশকে এখন “মধ্যম-ঝুঁকিপূর্ণ” দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রপ্তানি ও রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় এ অবস্থানে নেমে এসেছে দেশটি।
রিপোর্টে দেখা গেছে, ঋণ-রপ্তানি অনুপাত বর্তমানে ১৬২ শতাংশের বেশি—যা আগে অনুমিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি।
ভবিষ্যতের করণীয়:
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় অর্ধেক রাজস্ব সংগ্রহ করে বাংলাদেশ, যা বাড়াতে কর প্রশাসন আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং এনবিআরকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি।
এছাড়া নতুন ঋণ নেওয়ার সময় সুদহার, উৎস, পরিশোধের শর্ত ও গ্রেস পিরিয়ড বিবেচনা করে সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি—যাতে পুরনো ঋণ শোধের জন্য নতুন ঋণ নিতে না হয়।
সমন্বিত ঋণ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ:
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকার একটি সমন্বিত ঋণ ব্যবস্থাপনা কার্যালয় (DMO) গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একাধিক সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ছড়িয়ে থাকার ফলে ঋণ পরিচালনায় সমন্বয়ের ঘাটতি, তথ্য বিভ্রান্তি ও ঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দুই সংস্থা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি ও গ্যারান্টিযুক্ত সব ঋণ ব্যবস্থাপনা অর্থ বিভাগের অধীনে একীভূত করা হবে। প্রথম ধাপে ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা শাখাকে পুনর্গঠন করা হবে।
নতুন ডিএমও দেশীয় ঋণ ইস্যু তদারকি, বার্ষিক ঋণ পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিলাম ব্যবস্থাপনা, ঋণ পোর্টফোলিওর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সমন্বিত ঋণ ডাটাবেজ তৈরি করবে।
এজন্য প্রয়োজন পেশাদার জনবল, আধুনিক আইটি ব্যবস্থা, পরিষ্কার আইনি কাঠামো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়।
অর্থ বিভাগ মনে করছে, ডিএমও চালু হলে বাজারে আস্থা বাড়বে, ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হবে।












