আল-আজহার মসজিদে বর্ণাঢ্য আয়োজনে মিশরে হিজরি নববর্ষ বরণ
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপলক্ষ হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮ উদযাপিত হয়েছে প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহ্য এবং উৎসবমুখর পরিবেশে নতুন হিজরি বছরকে বরণ করে নিয়েছেন মিশরীয়রা। এ উপলক্ষে রাজধানী কায়রোসহ দেশের বিভিন্ন শহরের মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা এবং নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ, দেশটির সর্বোচ্চ ফতোয়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘দার আল-ইফতা’ মহররম মাসের চাঁদ দেখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় নববর্ষের উদযাপন। রাজধানী কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও গিজাসহ অন্যান্য বড় শহরের মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই নতুন বছরের শুরুতে নফল ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত এবং বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় মিশরে হিজরি নববর্ষের উদযাপন একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক রূপ ধারণ করে। এ উপলক্ষে নতুন পোশাক পরিধান, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, বিশেষ খাবারের আয়োজন এবং সামাজিক মিলনমেলার ঢল নামে। আল-আজহার মসজিদে বিশেষ অনুষ্ঠানহিজরি নববর্ষ উপলক্ষে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আল-আজহার শরীফ এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কায়রোর ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে শীর্ষস্থানীয় আলেম, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— আল-আজহার শরীফের প্রতিনিধি আবদুল গনি, মিশরের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ড. সালামা দাউদ, মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি ড. নজির আয়াদ এবং ইসলামিক রিসার্চ কমপ্লেক্সের মহাসচিব ড. মোহাম্মদ আল-জিন্দি।এছাড়াও আল-আজহার ইনস্টিটিউটস সেক্টরের প্রধান ড. আহমেদ আল-শারকাওয়ি, মিশরের আশরাফ সংগঠনের প্রধান শরীফ মাহমুদ শরীফ, সুফি তরিকার সর্বোচ্চ পরিষদের প্রধান ড. আবদুল হাদি আল-কাসাবি, আল-আজহারের সাবেক প্রতিনিধি ড. মোহাম্মদ আবদুর রহমান আল-দুওয়াইনি, সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ড. শওকি আল্লাম এবং আল-আজহার সুপ্রিম কাউন্সিলের মহাসচিব ড. ইসমাইল আল-হাদ্দাদসহ অসংখ্য বিশিষ্ট আলেম ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এতে অংশ নেন।
শান্তি ও ঐক্যের আহ্বান অনুষ্ঠানে বক্তারা হিজরি নববর্ষের তাৎপর্য তুলে ধরে মানবতা, সহমর্মিতা, শান্তি ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তারা মুসলিম বিশ্বের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্য, জ্ঞানচর্চা এবং ইসলামের মধ্যপন্থী ও সহনশীল শিক্ষার প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় আল-আজহার শরীফের ঐতিহাসিক ভূমিকাও তুলে ধরা হয়।
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবহে মুখরিত এই অনুষ্ঠানটি মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ, সমৃদ্ধি এবং বিশ্ব মানবতার মঙ্গল কামনায় বিশেষ দোয়ার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। হিজরি সনের তাৎপর্য নতুন হিজরি বছরের সূচনায় মিশরের মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মশুদ্ধি এবং ইসলামের আদর্শ অনুসরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক চেতনাকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ে দেশজুড়ে উদযাপিত হয়েছে হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮।
উল্লেখ্য, ইসলামের ইতিহাসে হিজরি সনের সূচনা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনযাত্রার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও আচার-অনুষ্ঠান—যেমন পবিত্র রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, আশুরা এবং অন্যান্য ধর্মীয় দিবস—এই হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ফলে হিজরি নববর্ষ শুধু একটি নতুন বছরের সূচনাই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মিক মূল্যবোধেরও এক অনন্য স্মারক।













