লন্ডনে তৃতীয় বাংলা: সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার এক জীবন্ত পরিসর
লন্ডন শহরটি আজ শুধু প্রবাসীদের বসবাসের জায়গা নয়; এটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও বটে। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের অলিগলি, কমিউনিটি হল কিংবা উন্মুক্ত পার্কগুলোতে যখন কবিতা পাঠ, বইমেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, তখন মনে হয় যেন বাংলারই এক সম্প্রসারিত ভূখণ্ড এখানে গড়ে উঠেছে। এই ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক চর্চাকে অনেকেই বলেন “তৃতীয় বাংলা সাহিত্য আন্দোলন”—বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের এক নতুন অধ্যায়।
লন্ডনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা নতুন নয়। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে অনেক ভাষা সৈনিক এখানে বসবাস করেছেন এবং এখনো তাদের প্রভাব প্রবাসী সমাজে অনুভূত হয়। ভাষা সৈনিক তাসাদ্দুক আহমদ, আব্দুল মতিন, আমীর আলী, এবং প্রখ্যাত লেখক-সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের পথ ধরেই নতুন প্রজন্মের লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা আজ লন্ডনে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ করে যাচ্ছেন।
এই ধারাবাহিকতায় প্রবাসে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান সংগঠন হলো সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ। প্রায় এক যুগ ধরে সংগঠনটি সুনামের সাথে বইমেলা, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যকে সংগঠিতভাবে এগিয়ে নিতে এই সংগঠনের অবদান অনেক। আমি নিজেও এই সংগঠনের কার্যকরী কমিটির একজন সদস্য হিসেবে কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে প্রবাসী মানুষের ভালোবাসা ও উদ্যোগে এসব আয়োজন সফল হয়ে ওঠে।
শুধু একটি সংগঠন নয়, লন্ডনে এখন অসংখ্য সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সক্রিয়। যেমন—কাব্যকথা পরিষদ, কবিতা স্বজন, কবিকণ্ঠ, বিশ্বকবিমঞ্চ, দর্পণ বুক ক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই ইন দ্য ইউকে, হরিজন ইউকে, উদিচি শিল্পী গোষ্ঠী , বুক ওয়ার্ম ক্যাফে লাভিস্টা, Souldance Film Club। এসব সংগঠন নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা, বই আলোচনা, কবিতা উৎসব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। ফলে প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
লন্ডনে বাংলা সাহিত্যচর্চার পেছনে অনেক ব্যক্তির অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লেখক হিরন্ময় ভট্টাচার্য, গবেষক অধ্যাপক গোলাম মুর্শিদ, ডাক্তার মাসুদ আহমদ, লেখক-সাংবাদিক কাদের মাহমুদ, সালেহা চৌধুরী , শামীম আজাদ, রেনু লুৎফা, কবি হামিদ মোহাম্মদ, নূরুজ্জামান মনি, ময়নূর রহমান বাবুল, কবি আতাউর রহমান মিলাদ, আহমদ ময়েজ, দিলু নাসের, ফারুক আহমদ রনি, মুজিব ইরম, ইকবাল হোসেন বুলবুল, আবু তাহের, আনোয়ার শাহজাহান, আবু মকসুদ, কাজল রশীদ, মুজিবুল হক মনি, ফারুক যোশী, মোহাম্মদ ইকবাল, এ কে এম আবদুল্লাহ, উদয় শংকর দুর্জয় , ইমদাদুন খান, আসমা মতিনসহ আরও অনেকে সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন।
বর্তমান সময়ে প্রবাসে বাংলা ভাষার লেখালেখির জগতে উল্লেখযোগ্য নাম ড. আজিজুল আম্বিয়া। তিনি বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে পাঠকমহলে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন। একইভাবে সৈয়দ হিলাল সাইফ, আনোয়ারুল হক অভি এবং আরও অনেক লেখক-সাংবাদিক প্রবাসে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছেন।
প্রবাসে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও লন্ডনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অনেক সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। সৈয়দ নাহাস পাশা, নজরুল ইসলাম বাসন, মহিব চৌধুরী, মতিয়ার চৌধুরী, দেওয়ান ফয়সল , প্রয়াত ইসহাক কাজল, মোহাম্মদ বেলাল আহমদ, এমদাদুল হক চৌধুরী, নবাব উদ্দিন,সুজাত মনসুর,সৈয়দ বদরুল আহসান, আবু মুসা হাসান, নিলুফা হাসান, মহি উদ্দিন সরকার, রেজা ফয়সল আহমদ চৌধুরী,শাহ মনসুর আলী নোমান,মাসুদা ভাট্টি, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, সৈয়দ বেলাল আহমদ, মিসবা জামাল, সৈয়দ আনাস পাশা, কে এম আবু তাহের চৌধুরী, সাঈদ চৌধুরী, তাইসির মাহমুদ, রহমত আলী, আনসার আহমদ উল্লাহ্, উর্মি মজহার,মকিস মনসুর,মুহিব চৌধুরী , শাহ ইউসুফ, মোহাম্মদ জুবায়ের, ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী, আকরামুল হোসাইন, সাকির হোসাইন , তৌহিদুল করিম মোজাহিদ, সাঈম চৌধুরী ,আজিজুল আম্বিয়া, আফজাল হোসেন , আহাদ চৌধুরী বাবু, আসম মাসুম ,জাকির হোসেন কয়েস,সোয়েব কবির, মোহাম্মদ শাহেদ রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গৌছ সুলতান,কামরুল আই রাসেল,সুয়েজ মিয়া , এ রহমান অলি প্রমুখ সাংবাদিকতা পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। প্রবাসী বাংলা মিডিয়া আজ শুধু কমিউনিটির খবরই নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিষয়গুলো তুলে ধরছে।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও লন্ডনে এক উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। হিমাংশু গোস্বামী, এমদাদ তালুকদার এমবিই, মাহমুদুর রহমান বেনু, কাউসার হাবিব, রিপা রকিব, গৌরী চৌধুরী, মিতা তাহের, সাইফুল ইসলাম, রুকসান সাফা, কায়া, সেতু চৌধুরী . মাহফুজা রহমান, স্মৃতি আজাদ, নজরুল ইসলাম অকিব , আলাউর রহমান,শেখ নুরুল ইসলাম, হেনা বেগম সহ অনেক শিল্পী নিয়মিত গান, নৃত্য ও নাটকের মাধ্যমে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখছেন। পাশাপাশি ইতিহাসবিদ ও গবেষক ফারুক আহমদও প্রবাসে ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
প্রতি বছর বৈশাখী মেলাও লন্ডনে ব্যাপক উৎসাহ ও আনন্দের সাথে উদযাপিত হয়। এই মেলা শুধু একটি উৎসব নয়; এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। খাবার, গান, নৃত্য, বই এবং নানা আয়োজনের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র সেখানে দেখা যায়।
পূর্ব লন্ডনের Altab Ali Park–এর শহীদ মিনার এসব সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। ভাষা শহীদদের স্মরণে এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান হয়, পাশাপাশি একুশে ফেব্রুয়ারি, বইমেলা কিংবা কবিতা উৎসবের অনেক আয়োজনও এই স্থানকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। বইমেলা উপলক্ষে বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টল বসে এবং আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিশিষ্ট শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লন্ডনে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সংখ্যা আরও বেড়েছে। নতুন নতুন সংগঠন, ব্যক্তিগত উদ্যোগ কিংবা যৌথ উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠান হচ্ছে। কিছুদিন আগে একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী শুভ্র দেব লন্ডনে এসে গান পরিবেশন করেছেন। আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুরস্কার ও ভারতের পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা লন্ডনের মে ফেয়ার এভিনিউতে গান গাইবেন বলে জানা গেছে। এর আগে এখানে গান পরিবেশন করেছেন কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা এবং সাবিনা ইয়াসমিন।
লন্ডনে বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোও যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কিংবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান হয়। পাশাপাশি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং কবি জীবনানন্দ দাশ–এর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতেও গভীর শ্রদ্ধার সাথে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
প্রবাসের এই সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে অনেকেই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাদের স্মৃতি, অবদান এবং পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই পরিসর গড়ে উঠেছে। আবার নতুন প্রজন্মের লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই আগামী দিনে লন্ডনের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সবশেষে বলা যায়, লন্ডনে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির যে ধারাবাহিক চর্চা চলছে, তা কেবল প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বব্যাপী বাংলা সংস্কৃতির বিস্তারের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই তৃতীয় বাংলার সাহিত্যচর্চা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এবং প্রমাণ করছে—বাংলা ভাষা শুধু একটি দেশের নয়, এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষের হৃদয়ের ভাষা।
লেখকঃ ড. আজিজুল আম্বিয়া, কলাম লেখক ও গবেষক । [email protected]













