‘তারুণ্য ও মর্যাদা’ স্লোগানে এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে দলটি।
‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামে ঘোষিত এই প্রস্তাবনায় দারিদ্র্য বিমোচন, সুশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্রনীতিসহ নানা খাতে পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীরাও অংশ নেন।
ইশতেহারে জুলাই সনদের আইনভিত্তিক দফাগুলো বাস্তবায়নে স্বাধীন কমিশন গঠন, অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বৈষম্য প্রতিরোধে মানবাধিকার কমিশনের অধীনে বিশেষ সেল গঠনের কথা বলা হয়েছে।
সুশাসন নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ, ‘হিসাব দাও’ পোর্টাল চালু, পারফরম্যান্সভিত্তিক পদোন্নতি এবং বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এনআইডিভিত্তিক একক সেবা ব্যবস্থা চালুর কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অর্থনীতিতে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের সুরক্ষা ও পেনশন নিশ্চিত করা, টিসিবি কার্ড ব্যবস্থায় সংস্কার, সামাজিক আবাসন প্রকল্প, কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করা এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবসা পরিবেশ গড়ার অঙ্গীকারও রয়েছে।
তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ভোটাধিকার বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা এবং ইয়ুথ সিভিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এসএমই খাতে বিশেষ তহবিল, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং প্রবাসে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পরিকল্পনাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত।
শিক্ষা খাতে সংস্কার কমিশন গঠন, শিক্ষকদের পৃথক বেতন কাঠামো, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ জাতীয়করণ এবং উচ্চশিক্ষায় বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালুর কথা বলা হয়েছে। গবেষণায় প্রবাসী মেধা ফেরাতে বিশেষ প্রণোদনা এবং জাতীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বিশেষায়িত চিকিৎসা জোন, জাতীয় অ্যাম্বুল্যান্স নেটওয়ার্ক, আধুনিক আইসিইউ-সিসিইউ সুবিধা, এনআইডিভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং ধাপে ধাপে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার সুবিধা এবং নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের অঙ্গীকার রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল পোর্টাল, রেমিট্যান্সভিত্তিক বিনিয়োগ সুবিধা এবং বিমানবন্দর ও দূতাবাসে হয়রানি রোধে নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা এবং কৃষিতে সরাসরি ভর্তুকি প্রদানের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও ভেজালবিরোধী কঠোর অবস্থানের কথাও রয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে সীমান্ত ইস্যু, নদীর পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক সমাধান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে রিজার্ভ ফোর্স সম্প্রসারণ, ইউএভি ব্রিগেড গঠন এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংযোজনের পরিকল্পনাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত।
দলটির নেতারা জানান, এই ইশতেহারের মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে একটি মর্যাদাপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা তুলে ধরেছেন।













