ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আচরণবিধির কড়াকড়ি
৯৪ মামলা, জরিমানা ৯ লাখ টাকা, প্রবাসী ভোটে রেকর্ড সাড়া
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বহুল আলোচিত গণভোটকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবারের নির্বাচনকে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রচার-প্রচারণা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও সামনে আসছে, যার বিপরীতে প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা হয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, প্রচার শুরুর পর থেকে সারাদেশের ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় মোট ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গুরুতর অনিয়মের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও কমিশনের সরাসরি হস্তক্ষেপে মোট ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার দাবি করেন, “নির্বাচনী মাঠ এখন পর্যন্ত স্বচ্ছ রয়েছে। প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।”
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট নিয়েও কমিশন কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। ইসি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারবেন না।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বলেন, “এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। আমাদের লক্ষ্য কেবল অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা।” তবে সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের প্রচারণা চালানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এবারের নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীদের অংশগ্রহণে অভাবনীয় সাড়া মিলেছে।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান জানান, ২৭ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত—
- মোট পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধন: ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন
- প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন: ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন
- ব্যালট গ্রহণ করেছেন: ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯২০ জন
- ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন: ৪ লাখ ২৫ হাজার ৭৮৮ জন
- বাংলাদেশে পৌঁছেছে: ২১ হাজার ৫০৮টি ব্যালট
এই উদ্যোগ দীর্ঘদিনের প্রবাসী ভোটাধিকার দাবির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অতীতের নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া অনাস্থা কাটিয়ে উঠতে নির্বাচন কমিশন দৃশ্যমান তৎপরতা চালাচ্ছে বলে দাবি করেছে। আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ভোটাররা এবার আস্থা নিয়ে কেন্দ্রে আসবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আচরণবিধি লঙ্ঘনে দ্রুত মামলা ও জরিমানার ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, ইসি মাঠ প্রশাসনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়। তবে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ভোটের দিন মাঠপর্যায়ে সমতা, নিরাপত্তা এবং ভোটার উপস্থিতির ওপর।
একদিকে প্রবাসীদের মধ্যে ভোটে ব্যাপক উৎসাহ, অন্যদিকে দেশে আচরণবিধি বাস্তবায়নে কড়াকড়ি—এই দুই দিক সমন্বয় করতে পারলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।













