দেশে ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, গাঁজায় আসক্ত ৬১ লাখ
জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে পরিণত মাদক সমস্যা: জাতীয় গবেষণা
বাংলাদেশে মাদক ব্যবহার আর গোপন কোনো সমস্যা নয়—এটি এখন একটি দৃশ্যমান জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ।
রোববার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দেশে মাদক ব্যবহার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে এতে সিগারেট সেবনকে মাদক ব্যবহারের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ গবেষণাটি যৌথভাবে সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল)। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালে নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি হার পাওয়া গেছে,
- ময়মনসিংহে ৬.০২ শতাংশ,
- রংপুরে ৬.০০ শতাংশ,
- চট্টগ্রামে ৫.৫০ শতাংশ।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম হার দেখা গেছে,
- রাজশাহীতে ২.৭২ শতাংশ,
- খুলনায় ৪.০৮ শতাংশ।
সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে, প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার। এরপর রয়েছে চট্টগ্রামে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার এবং রংপুরে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার। সব মিলিয়ে দেশে যেকোনো ধরনের মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার।
মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়,
- গাঁজা (ক্যানাবিস): প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার
- ইয়াবা/মেথামফেটামিন: প্রায় ২৩ লাখ
- অ্যালকোহল: প্রায় ২০ লাখ
- এছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনের ব্যবহারও রয়েছে।
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যাদের মধ্যে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদকও সেবন করে থাকেন।
অল্প বয়সেই মাদকে জড়ানো
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
- ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮–১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করে,
- ৫৯ শতাংশ শুরু করে ১৮–২৫ বছর বয়সে।
বেকারত্ব, বন্ধুমহলের চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা—এসবকে মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন—মাদক সহজেই পাওয়া যায়।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থায় হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন, তবে পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সফল হতে পারেননি।
মাদক ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন—
- চিকিৎসা ও পুনর্বাসন (৬৯ শতাংশ),
- কাউন্সেলিং (৬২ শতাংশ),
- কর্মসংস্থান সহায়তা (৪১ শতাংশ)।
এছাড়া ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গবেষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। তাই দমনমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, “আমরা ভাবি মাদকাসক্তরা অন্য কেউ। কিন্তু বাস্তবে আমরা এবং আমাদের সন্তানেরাও ঝুঁকির মধ্যে আছি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিপদ মোকাবিলা করতে হবে।”
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, পরিবার থেকেই মাদক প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সম্প্রসারণে ঢাকা ছাড়াও সাত বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, শিশু ও তরুণদের মাদকের ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সরবরাহ ও চাহিদা—দুটিই কমাতে হবে।










