দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি: হাইকোর্ট
মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা ও আইনি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে হাইকোর্ট। সাম্প্রতিক এক রিট আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর একক অনুমতির চেয়ে আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের অনুমতিই আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত বিবেচিত হবে।
২৪ পৃষ্ঠার রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেছে, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টি সরাসরি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত। প্রচলিতভাবে মনে করা হতো, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা আইনত গুরুতর অপরাধ এবং নৈতিক লঙ্ঘন। তবে আদালতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আইনে স্ত্রীর অনুমতিকে একক ও বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
আদালত বলেন, আরবিট্রেশন কাউন্সিল যদি মনে করে যে দ্বিতীয় বিয়ের পেছনে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ রয়েছে, তাহলে তারা সেই বিয়ের অনুমতি দিতে পারে। ফলে স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই চূড়ান্ত নির্ধারক নয়। এই রায়ের মাধ্যমে বহুবিবাহ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক কাঠামোর ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আইনি ইতিহাস তুলে ধরে রায়ে বলা হয়, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় স্বামী বা স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পরে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রণীত হলে পুরুষের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির আওতায় আনা হয়। সে ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন রিটকারীরা। তাদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্ত বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারে এবং নারীদের আইনি সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে প্রথম স্ত্রীর সম্মতিকে বাধ্যতামূলক রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি আপিল বিভাগে গেলে বহুবিবাহ, পারিবারিক আইন ও নারী অধিকার নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে। সমাজ বিজ্ঞানীরাও সতর্ক করেছেন, আর্থিক সক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রলোভনের কারণে কেউ কেউ এই সুযোগের অপব্যবহার করতে পারেন, যা ভবিষ্যতে পারিবারিক অস্থিরতা ও সামাজিক বৈষম্য বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, হাইকোর্টের এই রায় মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহ সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা এখন সর্বোচ্চ আদালতের ওপর নির্ভর করছে।













