বিক্ষোভে উত্তাল ইরান: খামেনির শাসন কি চ্যালেঞ্জের মুখে?
ইরানে নতুন বছরের বিক্ষোভ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন দেশটি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভরা একটি বছর শেষ করেছে।
২০২৫ সালে ইসরায়েল ইরানের ওপর টানা ১২ দিনের হামলা চালায়। এতে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ফোরদো, ইসফাহান ও নাতানজে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
বছরের শেষ দিকে রাজধানী তেহরানসহ মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০২৫ সালের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত এই আন্দোলন চলতে থাকে।
ইরানে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশটিতে হাজার হাজার আন্দোলন হয়েছে। কখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, কখনো আবার অর্থনৈতিক সংকট এসব আন্দোলনের মূল কারণ হয়েছে।
ইরানে আন্দোলন বারবার ফিরে আসে মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পারস্পরিক প্রভাবের কারণে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে।
২০২৫ সালের শেষের দিকের বিক্ষোভ শুরু হয় ব্যবসায়ী ও বাজার মালিকদের ধর্মঘটের পর। ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ায় তারা রাস্তায় নামেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ইরানি রিয়ালের প্রায় ৫০ শতাংশ মূল্যপতন এবং বেকারত্ব বেড়ে ৭.৫ শতাংশে পৌঁছানো এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এর আগেও অর্থনৈতিক কারণে ইরানে অস্থিরতা দেখা গেছে। ২০০৮ সালে মূল্য সংযোজন কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাজারে আন্দোলন শুরু হলে তৎকালীন সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ২০১০ সালেও আয়কর ৭০ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা ব্যর্থ হয় জনরোষের মুখে।
ইরানের প্রায় সব আন্দোলনেই অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠে এসেছে। বাধ্যতামূলক হিজাব আইন এর বড় উদাহরণ। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এই ইস্যুতে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়, যা সরকারের ব্যাখ্যায় জনগণের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
তবে এসব আন্দোলনের পরও কাঠামোগত কোনো বড় সংস্কার হয়নি। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প খাত গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু পারমাণবিক সংকট ঘনীভূত হওয়ায় তা সফল হয়নি।
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সরকার তেলের আয় সরাসরি জনগণের মধ্যে বিতরণের নীতি নেয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী গোষ্ঠীর বিরোধিতা ও জাতিসংঘের একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই নীতিও ব্যর্থ হয়। এসব নিষেধাজ্ঞা বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ কঠিন করে তোলে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য কতটা দায়ী নিষেধাজ্ঞা, আর কতটা দায়ী দুর্বল শাসনব্যবস্থা?
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে, যা ১৯৮০ সালের পর থেকে আর সমাধান করা হয়নি। আদর্শিক অগ্রাধিকার অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে বাধা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাল না মেলায় দেশটি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব তীব্র হয়।
চীনের সঙ্গে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বও ইরানের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারেনি। এসব সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের জনগণ মনে করে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাই অর্থনৈতিক দুরবস্থার অন্যতম কারণ। লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে ইরানের ভূমিকা নিয়ে “গাজা নয়, লেবানন নয়—ইরানের জন্য আমার জীবন” স্লোগান বহুবার শোনা গেছে।
তবে ২০২৫ সালের পর থেকে এই যুক্তি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমে গেছে এবং কিছু সামরিক কর্মকর্তাই এখন সিরিয়ার কাছে বিপুল অর্থ ফেরত চাচ্ছেন। এমনকি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ও প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, শুধু নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করা যাবে না—শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাও বড় কারণ।
বর্তমানে ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেখা যাচ্ছে। একদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক দুর্বলতার দায় স্বীকার করছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলছে। এই দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে এবং সরকার ও সমাজের দূরত্ব বাড়াচ্ছে।
ইসরায়েলের সামরিক আত্মবিশ্বাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংসের চিন্তাও আলোচনায় এসেছে। এমন সংঘাত ইরানকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ চাপ একসময় শাসনব্যবস্থার বড় পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে—যা ধীরে হলেও পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
(তথ্যসূত্র- আলজাজিরায় প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্য–বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহজুব জুইরির (Mahjoob Zweiri) লেখা নিবন্ধ অবলম্বনে।)













