স্পেন ও পর্তুগালের ভূগর্ভে চলছে নীরব পরিবর্তন, যা কেউ টের পায় না
শুনতে অবাক লাগলেও ভূতাত্ত্বিকদের মতে স্পেন ও পর্তুগাল যতটা স্থির মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, আইবেরিয়ান উপদ্বীপটি খুব ধীরে নিজ অক্ষের চারপাশে ঘুরছে। এই পরিবর্তন এতটাই ধীর যে মানুষ তা কখনো অনুভব করতে পারবে না। তবে হাজার হাজার বা লক্ষ বছরের হিসাবে এই গতি বাস্তব এবং তা স্পেন ও পর্তুগালের ভূমিকম্পের রহস্য ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করছে।
ভূবিজ্ঞানীদের মতে, স্পেন ও পর্তুগাল পৃথিবীর একটি টেকটোনিক প্লেটের ওপর অবস্থান করছে, যা পৃথিবীর ভেতরের নরম স্তরের ওপর ভাসমান অবস্থায় খুব ধীরে চলতে থাকে। সাধারণত এসব প্লেট নির্দিষ্ট দিকেই সরে যায়। তবে আফ্রিকা ও ইউরেশিয়া প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে, বছরে প্রায় চার থেকে ছয় মিলিমিটার করে দূরত্ব কমছে।
বিশ্বের অনেক জায়গায় এমন পরিস্থিতিতে স্পষ্ট ফল্ট লাইন বা সাবডাকশন জোন তৈরি হয়। কিন্তু দক্ষিণ আইবেরিয়া অঞ্চলে বিষয়টি ভিন্ন। ‘গন্ডওয়ানা রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে আফ্রিকা ও ইউরেশিয়া প্লেটের সীমারেখা স্পষ্ট নয়, বরং তা জটিল ও বিস্তৃত। ফলে চাপ কোনো একটি বড় ফল্টে সীমাবদ্ধ না থেকে স্পেন ও পর্তুগাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
এর ফল হিসেবে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ইউরোপের সঙ্গে সরাসরি উত্তর দিকে না সরে ধীরে ধীরে ঘুরছে, ঠিক যেন দুটি শক্তির মাঝে আটকে থাকা একটি গিয়ার।
এই ভূতাত্ত্বিক গতিবিধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আলবোরা́n অঞ্চল, যা দক্ষিণ স্পেন ও উত্তর মরক্কোর মাঝামাঝি বিস্তৃত। এই এলাকা আফ্রিকা ও ইউরেশিয়া প্লেটের চাপে পশ্চিম দিকে ঠেলে যাচ্ছে, ফলে দক্ষিণ দিকের চাপের সঙ্গে পাশ থেকে আরেকটি শক্তি যুক্ত হচ্ছে। এ কারণেই জিব্রাল্টার আর্ক নামে পরিচিত বাঁকানো পাহাড়ি অঞ্চল তৈরি হয়েছে, যা দক্ষিণ স্পেনের বেটিক পর্বতশ্রেণি ও মরক্কোর রিফ পর্বতকে যুক্ত করেছে।
সব জায়গায় এই চাপ সমানভাবে কাজ করছে না। কোথাও আফ্রিকা প্লেট সরাসরি ইউরেশিয়ার দিকে ধাক্কা দিচ্ছে, আবার কোথাও চাপ পাশ দিয়ে সরে গিয়ে ভূমিকে ধীরে স্লাইড করতে দিচ্ছে। জিব্রাল্টার প্রণালীর দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে আফ্রিকা প্লেট একটি বিশাল পিস্টনের মতো কাজ করছে, যা আইবেরিয়ান উপদ্বীপকে এমনভাবে ঠেলে দিচ্ছে যে সেটি ঘুরতে বাধ্য হচ্ছে।
এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম গতিবিধি শনাক্ত করা হয়েছে ভূমিকম্প সংক্রান্ত তথ্য ও স্যাটেলাইট জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে, যা বছরে মাত্র কয়েক মিলিমিটার পরিবর্তনও ধরতে সক্ষম।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এই তথ্য স্পেন ও পর্তুগালের ভূমিকম্প বোঝার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে অনেক ভূমিকম্প ঘটে যেগুলোর সঙ্গে দৃশ্যমান কোনো ফল্ট লাইনের সরাসরি মিল পাওয়া যায় না। গবেষক আসিয়ের মাদারিয়েতার মতে, আইবেরিয়ান অঞ্চলে এমন বহু এলাকা রয়েছে যেখানে ভূপৃষ্ঠের নিচে বিকৃতি ও ভূমিকম্প হচ্ছে, কিন্তু দায়ী কাঠামো চোখে দেখা যায় না।
পুরো উপদ্বীপটি ধীরে ঘুরছে—এই ধারণা বিজ্ঞানীদের ভূমিকম্পের চাপ কোথায় জমা হচ্ছে তা বুঝতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে। যদিও এতে ভূমিকম্প পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, তবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল শনাক্ত করা সহজ হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, স্পেন ও পর্তুগাল হঠাৎ করে বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে না। তবে এই গবেষণা প্রমাণ করছে, অঞ্চলটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস যতটা শান্ত মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি সক্রিয় ও গতিশীল।
মানুষের পায়ের নিচের মাটি শক্ত ও স্থির মনে হলেও, পৃথিবীর দীর্ঘ সময়ের হিসাবে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ নিঃশব্দে ঘুরেই চলেছে—মানুষের আগমনের অনেক আগ থেকে শুরু হওয়া শক্তির প্রভাবে, যা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
(সূত্র: বৈজ্ঞানিক জার্নাল Gondwana Research অবলম্বনে)













