সেনা হেফাজত থেকে আদালতে: গুম মামলার ১৫ সেনা কর্মকর্তা এখন কারাগারে
গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন কর্মকর্তাকে বুধবার আদালতে হাজিরের পর কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই সেনা কর্মকর্তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। সকাল সোয়া সাতটার দিকে “বাংলাদেশ জেল” লেখা সবুজ প্রিজন ভ্যানে করে তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়। সবাই ছিলেন সাদা পোশাকে, কারও মুখে ছিল মাস্ক।
শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এখন কারা কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করবে, তাঁরা কোন কারাগারে থাকবেন—ঢাকায়, চট্টগ্রামে বা অন্য কোথাও।” তিনি আরও জানান, আদালতের নির্দেশ অনুসারে আসামিরা এখন কারা কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকবেন।
সম্প্রতি সরকার সেনানিবাসের একটি ভবনকে বিশেষ কারাগার হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই কারাগারেই এই কর্মকর্তাদের রাখা হতে পারে। অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. তানভীর হোসেন বলেন, “আদালত থেকে তাঁদের সেনানিবাসের সাব-জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তাঁরা থাকবেন।”
অন্যদিকে, সেনা কর্মকর্তাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারওয়ার হোসেন বলেন, “তাঁরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁরা নির্দোষ, আর সেটি আদালতেই প্রমাণ হবে। যারা প্রকৃত অপরাধী, তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।”
ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা আজ ভোর থেকেই কঠোর নিরাপত্তায় ছিল। কাকরাইল, পল্টন, মৎস্য ভবন ও বাংলামোটর এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যদেরও টহল জোরদার করা হয়।
এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁরা গুম ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। একটি মামলায় আসামি ১৭ জন, আরেকটিতে ১৩ জন।
গুম-নির্যাতনের দুটি মামলার একটিতে আসামিদের মধ্যে রয়েছেন র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসরে), এবং র্যাব গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও সারওয়ার বিন কাশেম।
আরেক মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক—মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী—এখন সেনা হেফাজতে রয়েছেন।
এই মামলায় আরও আসামি আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক—লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
এর আগে ৮ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণের পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ১১ অক্টোবর সেনাবাহিনী জানায়, ১৫ কর্মকর্তাকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বুধবার তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়, যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো গুম-নির্যাতনের মামলায় সেনা কর্মকর্তাদের সরাসরি ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলো।










