৩৪ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু নির্বাচন: উৎসবমুখর ক্যাম্পাসে চলছে ভোটগ্রহণ
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলছে। লাইনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায়। ছবি- সংগৃহীত।
দীর্ঘ ৩৪ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কারণ ১৯৮৯ সালের পর এটাই প্রথম রাকসু ভোট। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারায় চলছে ভোটগ্রহণ।
এবার রাকসুর পাশাপাশি হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত বিভিন্ন ভবন ও হলে একযোগে চলছে। একজন ভোটারকে রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট মিলিয়ে ৪৩টি পদে ভোট দিতে হচ্ছে। এজন্য প্রতিটি ভোটারকে ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি ভোট দিতে ১৪ সেকেন্ডের মতো সময় পাচ্ছেন ভোটাররা। প্রশাসনের দাবি, দ্রুত ভোটগ্রহণের সুবিধার জন্যই এমন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্বতন্ত্র প্যানেল। এর মধ্যে আছে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’, ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’, বাম সংগঠনের যৌথ প্যানেল ও কিছু স্বাধীন প্রার্থী। নির্বাচনে মোট ভোটার কয়েক হাজার এবং প্রার্থী সংখ্যা কয়েক শ। নির্বাচনের আগে থেকেই ক্যাম্পাসে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, তবে ভোটের দিন সকাল থেকে প্রশাসনের কড়াকড়ি বাড়ায় পরিবেশ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ও শান্ত।
ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাইরের লোকজনের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভোটের সময় প্রচারণা, মাইক ব্যবহার বা খাবার বিতরণেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করার জন্য। এদিকে, সকাল থেকেই কিছু কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণ চলছে ধীর গতিতে। কোথাও কোথাও ভোট দিতে দেরি হচ্ছে ব্যালট যাচাই ও নাম মিলিয়ে দেখার কারণে।
এদিকে কিছু ভোটকেন্দ্র থেকে অভিযোগ উঠেছে, ভোটের কালি দ্রুত উঠে যাচ্ছে। ভোটারদের আঙুলে চিহ্ন স্পষ্টভাবে না থাকায় পুনরায় ভোটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, এ ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, আনসার ও বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েক স্তরের বাহিনী। এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ বা অনিয়মের খবর পাওয়া যায়নি। তবে কিছু হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থকদের সঙ্গে ক্ষুদ্র বাকবিতণ্ডার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোট শেষে তাৎক্ষণিকভাবে গণনা শুরু হবে এবং রাতে ফলাফল ঘোষণা করা হতে পারে। রাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণ ও ছাত্রকল্যাণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখবেন।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এত বছর পর রাকসুর নির্বাচন শুধু ছাত্ররাজনীতির পুনর্জাগরণেরই ইঙ্গিত নয়, এটি দেশের শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তারা মনে করছেন, এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে। অনেকের মতে, এটি দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ পুনরায় চালুর পথও খুলে দিতে পারে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করাই তাদের লক্ষ্য। এখন সবার নজর ভোটের ফলাফলের দিকে, যা নির্ধারণ করবে তিন দশক পর পুনরায় সক্রিয় হওয়া রাকসুর নেতৃত্ব কাদের হাতে যাচ্ছে।










