গ্রিসের স্বপ্নে সাগরযাত্রা, মৃত্যুর দুয়ার থেকে মিশরে ৫৫ বাংলাদেশি
ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন ৫৫ বাংলাদেশি। মাত্র ৪০ জন ধারণক্ষমতার একটি রাবারের নৌযানে ৬৩ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়েন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত ফিলিপাইনের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাঁদের উদ্ধার করে মিশরের পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে আসে।
বর্তমানে এই ৫৫ বাংলাদেশি পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের হেফাজতে রয়েছেন। গ্রিসে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণ না হলেও প্রাণে বেঁচে ফেরাকে তাঁরা বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তাঁরা এখন দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরতে চান।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ আগস্ট ৫৫ বাংলাদেশি ও ৮ সুদানি নাগরিকসহ মোট ৬৩ জন লিবিয়ার তবরুক এলাকা থেকে একটি রাবারের নৌযানে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হন। একটি স্পিডবোট ইঞ্জিনের সাহায্যে পরিচালিত নৌযানটিতে কোনো কার্যকর নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। মানবপাচারকারীরা ২৪ থেকে ২৫ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানোর আশ্বাস দিলে ওই বিপজ্জনক নৌযানে ওঠেন তাঁরা।
কিন্তু যাত্রা শুরুর প্রায় চার ঘণ্টা পরই নৌযানটি কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে একটি এয়ার চেম্বার থেকে দ্রুত বাতাস বের হতে শুরু করে। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর বাতাস অনেক কমে গেলে নৌযানের একটি অংশ পানির খুব কাছাকাছি নেমে আসে এবং নেভিগেশন না থাকায় এটি দিক হারায়। সমুদ্রের ঢেউয়ের পানি ভেতরে ঢুকতে শুরু করলে তৈরি হয় চরম আতঙ্ক।
দালালদের সাড়া মেলেনি, উদ্ধার করে বাণিজ্যিক জাহাজ
উপায় না পেয়ে যাত্রীরা লিবিয়ার মানবপাচারকারীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে সমুদ্রে সংকেত পাঠিয়ে বিভিন্ন জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালান। প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ার পর ফিলিপাইনের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাঁদের উদ্ধার করে।
দুই দিন এক রাত সমুদ্রে
বাণিজ্যিক জাহাজটি উদ্ধারপ্রাপ্তদের নিয়ে প্রায় দুই দিন এক রাত পথ পাড়ি দিয়ে ২৭ আগস্ট মিশরের পোর্ট সাঈদ বন্দরে পৌঁছায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে। উদ্ধারপ্রাপ্তরা জানান, সময়মতো জাহাজটি না এলে নৌযানটি পুরোপুরি ডুবে গিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারত।
পরিচয় যাচাইয়ে দূতাবাসের তৎপরতা
ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ৪ সেপ্টেম্বর দূতাবাসের কর্মকর্তারা পোর্ট সাঈদে গিয়ে সুয়েজ ক্যানাল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তীতে তাঁরা আটক প্রতিটি বাংলাদেশির সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে তাঁদের পরিচয় ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যসহ কনস্যুলার সহায়তা প্রদান করেন।
দা
লালদের হাতে নিঃস্ব ১০ থেকে ২৩ লাখ টাকা
দূতাবাসের তথ্য মতে, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে লিবিয়ায় গিয়ে মৌখিক চুক্তিতে দালালদের সঙ্গে ইউরোপ যাওয়ার সমঝোতা করেন। জমি বিক্রি, ঋণ নেওয়া বা পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে তাঁরা দালালদের ১০ লাখ থেকে ২৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন।
দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চালু
বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলেই এই ৫৫ বাংলাদেশিকে দ্রুততম সময়ে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানবপাচার রোধে পদক্ষেপ জরুরি
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে অনিরাপদ রাবারের নৌযানে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে বিপুল অর্থ ও জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন প্রবাসপ্রত্যাশীরা। এই ঘটনা প্রমাণ করে, ভূমধ্যসাগরের এই অনিয়মিত পথ কতটা ভয়ংকর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভূমধ্যসাগরীয় রুটে সক্রিয় মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। পোর্ট সাঈদে উদ্ধার হওয়া ৫৫ বাংলাদেশির এই অভিজ্ঞতা অবৈধ পথে ইউরোপ গমনেচ্ছুদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।










