বোরকা-নেকাব নিয়ে ইউরোপে কড়াকড়ি, কোন দেশে কী নিয়ম?
বোরকা ও নেকাবসহ পুরো মুখ ঢেকে রাখার পোশাক নিয়ে ইউরোপে আবারও বিতর্ক জোরালো হয়েছে। পর্তুগাল সম্প্রতি জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢাকার পোশাক নিষিদ্ধ বা সীমিত করা ইউরোপীয় দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে। তবে ইউরোপজুড়ে এ বিষয়ে কোনো একক আইন নেই। কোথাও পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা, কোথাও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা স্থানে বিধিনিষেধ, আবার কোনো কোনো দেশে ধর্মীয় পোশাক পরার স্বাধীনতাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ফ্রান্স থেকেই শুরু
ইউরোপে জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢাকার পোশাক নিষিদ্ধ করার পথ দেখায় ফ্রান্স। ২০১১ সালে দেশটি বোরকা, নেকাবসহ মুখ পুরোপুরি ঢেকে ফেলার পোশাক নিষিদ্ধ করে। আইন ভাঙলে জরিমানা বা নাগরিক সচেতনতামূলক কোর্সে অংশ নেওয়ার শাস্তি হতে পারে।
ফরাসি সরকারের যুক্তি ছিল—জনসমক্ষে ব্যক্তির পরিচয় স্পষ্ট থাকা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মুখের অভিব্যক্তি ও পরিচয় সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেও যুক্তি দেওয়া হয়। তবে হিজাব, যা মুখ ঢাকে না, এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
বেলজিয়ামেও কঠোর ব্যবস্থা
ফ্রান্সের পর ২০১১ সালেই বেলজিয়াম জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু করে। আইন ভাঙলে জরিমানা এমনকি সর্বোচ্চ সাত দিনের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বেলজিয়ামও নিরাপত্তা, পরিচয় নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সংহতির বিষয়টিকে আইনের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
ডেনমার্কে পুরো মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ
ডেনমার্ক ২০১৮ সালে জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা চালু করে। বোরকা ও নেকাবের পাশাপাশি এমন যেকোনো পোশাকের ক্ষেত্রেও আইন প্রযোজ্য, যা মুখ পুরোপুরি আড়াল করে।
দেশটির যুক্তি—জনজীবনে মানুষের পরিচয় স্পষ্ট থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন
বুলগেরিয়ায় জনসমক্ষে নিষেধ
বুলগেরিয়ায় ২০১৬ সাল থেকে জনসমক্ষে বোরকা ও নেকাবসহ পুরো মুখ ঢাকার পোশাক নিষিদ্ধ। তবে স্বাস্থ্য বা পেশাগত প্রয়োজনের মতো কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। মুখ খোলা থাকে এমন সাধারণ হিজাব এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
অস্ট্রিয়ায় বোরকার পাশাপাশি স্কুলেও কড়াকড়ি
অস্ট্রিয়ায় ২০১৭ সাল থেকে জনসমক্ষে পুরো মুখ ঢাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বোরকা ও নেকাবের পাশাপাশি মুখের বৈশিষ্ট্য আড়াল করে এমন অন্যান্য সামগ্রীর ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগ করা যেতে পারে।
এর বাইরে ২০২৫ সালে অস্ট্রিয়ার পার্লামেন্ট ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের স্কুলে ইসলামি হেডস্কার্ফ পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করে।
নেদারল্যান্ডসে সব জায়গায় নয়
নেদারল্যান্ডস পুরো দেশে বোরকা-নেকাব নিষিদ্ধ করেনি। ২০১৯ সাল থেকে স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহনের মতো নির্দিষ্ট জায়গায় মুখ ঢাকার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
অর্থাৎ রাস্তাঘাটসহ সব জনপরিসরে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। মূলত যেখানে পরিচয় নিশ্চিত করা ও সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানেই বিধিনিষেধ বেশি কঠোর।
লুক্সেমবার্গেও নির্দিষ্ট স্থানে নিষেধ
লুক্সেমবার্গে ২০১৮ সাল থেকে স্কুল, হাসপাতাল, গণপরিবহন, আদালত ও জনসাধারণের জন্য খোলা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো জায়গায় পুরো মুখ ঢাকার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
জার্মানিতে এক নিয়ম নয়
জার্মানির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। দেশজুড়ে পুরো মুখ ঢাকার ওপর একটি অভিন্ন নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে কিছু রাজ্য ও নির্দিষ্ট পেশা বা পরিস্থিতিতে মুখ ঢাকার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
ফলে জার্মানিতে একজন ব্যক্তির জন্য কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে, তা অনেক ক্ষেত্রে তার অবস্থান, পেশা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
ইতালিতে পুরোনো আইনের ব্যবহার
ইতালিতে ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করার আলাদা কোনো জাতীয় আইন নেই। তবে ১৯৭৫ সালের একটি আইন জনসমক্ষে এমনভাবে মুখ ঢাকার ওপর বিধিনিষেধ দেয়, যাতে ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়।
আইনটি ধর্মীয় পোশাককে লক্ষ্য করে তৈরি হয়নি। তবে নিরাপত্তা-সংবেদনশীল কিছু পরিস্থিতিতে নেকাব বা বোরকার ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা হয়েছে।
স্পেনে কী নিয়ম?
স্পেনে দীর্ঘদিন ধরে বোরকা-নেকাব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একক নিষেধাজ্ঞা ছিল না। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেত।
তবে স্পেনের নীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে এবং দেশটিতে পুরো মুখ ঢাকার পোশাক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও বেড়েছে। তাই স্পেনের ক্ষেত্রে জাতীয় আইন, স্থানীয় বিধি ও নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ—তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
সুইডেনে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব
সুইডেনে ধর্মীয় পোশাকের ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে হিজাব বা নেকাব জনজীবনে পরার সুযোগ রয়েছে।
তবে কিছু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্কুলে বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করেছে। এসব উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এখন পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
গ্রিসে ধর্মীয় স্বাধীনতা, তবে বাস্তবে বিতর্ক
গ্রিসে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা রয়েছে। তবে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকবিধি নিয়ে মাঝেমধ্যে বিরোধ দেখা যায়।
২০২২ সালে একটি হাসপাতালে প্রশিক্ষণরত এক নার্সিং শিক্ষার্থীকে হিজাব পরতে বাধা দেওয়ার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। বিষয়টি ধর্মীয় বৈষম্যের বদলে প্রতিষ্ঠানের পোশাকবিধির প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পর্তুগাল কেন আলোচনায়?
পর্তুগালের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ইউরোপের চলমান বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশটির পার্লামেন্ট জনসমক্ষে ধর্মীয় বা লিঙ্গগত কারণে মুখ ঢাকার পোশাক নিষিদ্ধ করার একটি বিল অনুমোদন করে। এর আওতায় বোরকা ও নেকাব পড়বে। তবে স্বাস্থ্য, পেশা, শিল্প, নিরাপত্তা, আবহাওয়া এবং উপাসনালয়ের মতো কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
এ কারণে পর্তুগালের পদক্ষেপকে ‘সব ইসলামি পোশাক নিষিদ্ধ’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মূলত পুরো মুখ ঢেকে ফেলার পোশাকই এই বিধিনিষেধের লক্ষ্য।
কেন এত বিতর্ক?
ইউরোপে বোরকা-নেকাব নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকা সরকারগুলো সাধারণত নিরাপত্তা, পরিচয় শনাক্ত করা, সামাজিক যোগাযোগ ও একীভূত হওয়ার যুক্তি দেয়।
অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করেন, এ ধরনের আইন বিশেষ করে মুসলিম নারীদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে।
ফলে বিষয়টি শুধু পোশাকের নিয়ম নয়; এর সঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতা—সবকিছুই জড়িয়ে আছে।
এক ইউরোপ, এক আইন নয়
সব মিলিয়ে ইউরোপে বোরকা ও নেকাব নিয়ে কোনো অভিন্ন নীতি নেই। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক ও বুলগেরিয়ার মতো দেশে জনসমক্ষে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্থানে বিধিনিষেধ আছে। জার্মানিতে রাজ্য ও পরিস্থিতিভেদে নিয়ম আলাদা। আর সুইডেনের মতো দেশে জাতীয় পর্যায়ে ধর্মীয় পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই।
অর্থাৎ, ইউরোপে বোরকা-নেকাব নিয়ে বিতর্ক একই হলেও সমাধানের পথ এক নয়—কেউ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কেউ ব্যক্তিস্বাধীনতাকে, আবার কেউ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে।
তথ্যসূত্র: ইউরো নিউজ।













