এলিভাদর দুর্ঘটনায় পর্তুগালে শোকের মাতম: সর্বশেষ নিহত ১৬, আহত ২৩
ক্ষতিগ্রস্ত ফনিকুলারটি পরিদর্শন করছেন কর্মকর্তারা।
বুধবার ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় লিসবন শহরসহ পুরো পর্তুগালে চলছে শোকের মাতম। শহরের অন্যতম বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ‘এলিভাদর দা গ্লোরিয়া’–তে যখন খ্যাতনামা হলুদ রঙের একটি ফুনিকুলার (ঢাল বেয়ে ওঠা-নামা করা রেলযান) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লাইনচ্যুত হয়ে একটি ভবনে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
দুর্ঘটনায় সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কমপক্ষে ১৬ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হন।, এই দুর্ঘটনা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা:
দুর্ঘটনাটি স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ঘটে। ফুনিকুলারটি লিসবনের কেন্দ্রস্থল রেস্তোরাদোরেস স্কয়ার থেকে জনপ্রিয় বারিও আল্টো এলাকায় যাতায়াত করছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যাত্রাপথে হঠাৎ সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে “ব্রেকহীন অবস্থায়” দ্রুত নিচে নেমে আসে।
পর্তুগিজ গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, মূল ট্র্যাক টানার জন্য ব্যবহৃত তার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে ফুনিকুলারটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে সেটি প্রথমে অপর একটি যানে ধাক্কা দেয় এবং পরে পাশের ভবনে গিয়ে আছড়ে পড়ে।
৬০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী এবং ২২টি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরাই প্রথমে আহতদের উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
একজন পর্যটক গাইড, মারিয়ানা ফিগুয়েরেদো, সংবাদ মাধ্যম বিবিসিকে জানান: “কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি সেখানে পৌঁছে যাই। মানুষ জানালা ভেঙে লাফ দিচ্ছিল। পরে আরেকটি গাড়ি চূর্ণ হয়ে থাকতে দেখি। ভেতরে শুধু নীরবতা, তারপর একে একে মৃতদেহ বের করা হয়।”

হতাহতের তালিকা:
প্রথমে জরুরি সেবাদাতারা ১৫ জনের মৃত্যুর খবর দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে লিসবন সিভিল প্রোটেকশনের প্রধান মারগারিদা কাস্ত্রো জানান নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭ হয়েছে। তবে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্তেনেগ্রো নিশ্চিত করেন নিহতের সংখ্যা ১৬ জন।
মৃতদের মধ্যে রয়েছেন ৫ জন পর্তুগিজ, ২ জন দক্ষিণ কোরিয়ান, ২ জন কানাডিয়ান, ১ জন সুইস, ১ জন জার্মান, ১ জন মার্কিন নাগরিক, ১ জন ইউক্রেনীয়
এছাড়া আরও ৩ জনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায় নি।
প্রথম নিহত হিসেবে চিহ্নিত হন ফুনিকুলারের গার্ড-ফ্রেন্ডসম্যান আন্দ্রে মার্কেস। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্মরণ করেছে “দায়িত্বশীল ও প্রফুল্ল সহকর্মী” হিসেবে।
আহতদের মধ্যেও বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন—পর্তুগাল, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, কাবো ভার্দে, মরক্কো এবং সুইজারল্যান্ড।
একজন ৩ বছরের জার্মান শিশু জীবিত উদ্ধার হলেও তার বাবা নিহত এবং মা আহত হয়েছেন।

লিসবনে শোক:
লিসবনের মেয়র কার্লোস মোয়েদাস তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান শোকবার্তা পাঠিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক বিবৃতিতে বলেন, “পর্তুগালের জনগণের সঙ্গে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করছি।”
রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন:
দুর্ঘটনার পর থেকেই রক্ষণাবেক্ষণ প্রসঙ্গে নানা প্রশ্ন উঠছে। পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ম্যানুয়েল লিয়াল দাবি করেছেন, “ফুনিকুলারের রক্ষণাবেক্ষণ আবার পুর্বের নিজস্ব কর্মীদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করা নিরাপদ নয়।”
ফুনিকুলারের তত্ত্বাবধান করছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমএনটিসি । তবে তাদের চুক্তির মেয়াদ আগস্টে শেষ হয়েছে। কোম্পানি জানায়, সব রক্ষণাবেক্ষণ প্রোটোকল মেনে চলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এটি চালু হয় ১৮৮৫ সালে। তারপর এটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ১৯১৫ সালে বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার শুরু করা হয় এবং ২০০২ সালে এটি জাতীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়।
মাত্র ২৭৫ মিটার দীর্ঘ এই রুটটি রেস্তোরাদোরেস স্কয়ার থেকে বারিও আল্টোকে যুক্ত করে এবং তিন মিনিটেই যাত্রা শেষ হয়। উজ্জ্বল হলুদ রঙের কারণে এটি শুধু পরিবহনই নয়, লিসবনের প্রতীকী পর্যটন আকর্ষণ।
এর আগে ২০১৮ সালের ৭ মে একই ফুনিকুলার লাইনচ্যুত হয়েছিল, তবে সেবার কেউ হতাহত হননি।










