ঈদ ঘিরে মিশরে জমজমাট পশুর হাট, ফিলিস্তিনিদের পাশে বাংলাদেশি সংগঠনগুলো
নীলনদ ও পিরামিডের দেশ মিশরে পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে কুরবানির পশুর বেচাকেনা। আগামী বুধবার (২৭ মে) দেশটিতে উদযাপিত হবে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব। ঈদকে সামনে রেখে রাজধানী কায়রোসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে কুরবানির পশুর চাহিদা এবং ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যস্ততা তুঙ্গে।
বাংলাদেশের মতো মিশরে কুরবানির পশুর জন্য বড় আকারের অস্থায়ী হাটের প্রচলন খুব একটা দেখা যায় না। সাধারণত প্রধান সড়কের পাশে, মহল্লার অলিগলি, কসাইয়ের দোকানের সামনে কিংবা নির্ধারিত কিছু স্থানে পশু বিক্রি করা হয়। এছাড়া অনেক নাগরিক নিজ বাড়ির ছাদে বা ছোট খামারে পশু পালন করেন। তারা পরিবারের প্রয়োজনীয় অংশ রেখে অতিরিক্ত পশু ঈদের সময় বিক্রি করে দেন। রাজধানী কায়রোর কাছাকাছি গিজা জেলার নীলনদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত আল-মানশি এলাকায় একটি বড় পশুর বাজার রয়েছে, যেখান থেকে অধিকাংশ মানুষ কুরবানির পশু সংগ্রহ করেন।
এদিকে, চলতি বছর মিশরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর মাঝে কুরবানির মাংস বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশি কয়েকটি মানবিক সংগঠন। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে আলহাজ শামসুল হক (ASH) ফাউন্ডেশন, মাস্তুল ফাউন্ডেশন, ওয়ার্ল্ড ওয়ান উম্মাহ ফাউন্ডেশন, বিএম শাবাব, মাই ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন এবং হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) সেবা ফাউন্ডেশন।
সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই কায়রোর বিভিন্ন এলাকা থেকে উট, গরু ও দুম্বা ক্রয় কার্যক্রম শুরু করেছে। কুরবানির পর এসব পশুর মাংস মিশরে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং গাজার অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হবে।
চট্টগ্রাম থেকে আগত আশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নাছির উদ্দিন জানান,গত বছরের মতো এবারও আমরা বাংলাদেশিদের অনুদান নিয়ে মিশরে এসেছি। উট, গরু ও দুম্বা কিনে ঈদের দিন কুরবানি করে নির্যাতিত ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের মাঝে মাংস বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি গাজার অভ্যন্তরে স্থানীয় একটি সংস্থার সহযোগিতায় গৃহহীন, এতিম ও অসহায় পরিবারগুলোর মাঝেও মাংস পৌঁছে দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, এই পুরো কার্যক্রম সরেজমিনে তদারকি ও বাস্তবায়নের জন্য নিজ পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে মিশরে অবস্থান করছেন।
সরেজমিনে কায়রোর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মিশরে কুরবানির পশুর দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে ওজনভিত্তিক (কেজি দরে) খারুফ (দুম্বা): প্রতি কেজি প্রায় ৭০০ টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়)। ম্যাকসি ও ডাক্কার (ছাগল/পাঠা) এবং গেদ্দী (ছাগী): প্রতি কেজি প্রায় ৬৫০ টাকা।
গামাল (উট), বাকারা (গরু) ও গামুছা (মহিষ): প্রতি কেজি গড়ে ৫০০ টাকা।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, একটি মাঝারি আকারের দুম্বার ওজন প্রায় ৭০ কেজি, যার মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৯ হাজার টাকা। ৩০ কেজি ওজনের একটি মাঝারি খাসির দাম পড়ছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক দুম্বার ওজন ৫০ থেকে ৭৫ কেজির মধ্যে হলেও কিছু দুম্বা ১২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া বড় আকারের একটি গরুর মূল্য আড়াই থেকে তিন লাখ এবং একটি উটের দাম দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
মিশরে কুরবানির একটি ভিন্নধর্মী সামাজিক চিত্র চোখে পড়ে। জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকেই অনেক বিত্তবান মানুষ বাজার থেকে মাংস কিনে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ শুরু করেন। ফলে এ সময় কসাইয়ের দোকান এবং সুপারশপগুলোতে মাংসের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের মতো এখানে পশু কেনা নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা দেখা যায় না। উল্টো অনেক মিশরীয় কসাইয়ের দোকান থেকে মাংস কিনে ছোট ছোট প্যাকেট তৈরি করে গাড়িতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। পথচারী শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, দরিদ্র মানুষ, এমনকি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের দেখলেই তারা গাড়ি থামিয়ে মাংসের প্যাকেট হাতে তুলে দেন।
মিশরে সাধারণত ঈদের জামাত শেষ হওয়ার পর থেকে পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত কুরবানি করা হয়। বিভিন্ন মসজিদেও বিত্তবান ব্যক্তি বা সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে টানা কয়েকদিন কুরবানি করে দরিদ্র মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে সরকারিভাবে পশুর দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও মহল্লাভিত্তিক বিক্রেতারা নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা কম বা বেশি মূল্যে পশু বিক্রি করে থাকেন।
ধর্মীয় আচার, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক সহমর্মিতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে এভাবেই মিশরে এগিয়ে চলছে ঈদুল আজহার চূড়ান্ত প্রস্তুতি।













