যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ড: মরদেহ উদ্ধার, রুমমেট গ্রেপ্তার, তদন্তে নতুন মোড়
▪️রহস্য ঘনীভূত, তদন্তে নতুন তথ্য।
ছবিতে- (বামে) লিমনের রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহ টাম্পার একটি বাড়িতে নিজেকে আটকে রাখার পর তাকে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। ডানে উপরে- নিখোঁজ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। ডানে নিচে- জামিল লিমনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে ঘিরে আলোচিত হত্যাকাণ্ডে প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য সামনে আসছে। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই একজনের মরদেহ উদ্ধার এবং অন্যজনের মৃত্যুর প্রমাণ মেলায় ঘটনাটি এখন গভীর তদন্তের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নিহতদের একজন জামিল লিমনের মরদেহ ২৪ এপ্রিল স্থানীয় সময় সকালে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকার নিচে পানির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালানোর পর পানির নিচে তার দেহ খুঁজে পায়। মরদেহটি ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ছিল বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, একই ঘটনায় নিখোঁজ থাকা নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে পারিবারিক সূত্রে। তার ভাই জানিয়েছেন, একটি বাসার ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষায় মিল পাওয়া গেছে। তবে এখনো পুরো মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে এই অংশটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই শিক্ষার্থীই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা-এ পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। জামিল লিমন ভূগোল, পরিবেশ ও নীতি বিষয়ে এবং নাহিদা বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে গবেষণা করছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল সকালে আলাদা সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকে তাদের সর্বশেষ দেখা যায়। এরপর হঠাৎ করেই তাদের সঙ্গে পরিবার, সহপাঠী কিংবা পরিচিতদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নিখোঁজের বিষয়টি সামনে আসার পর হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযান শুরু করে। তদন্তের এক পর্যায়ে ঘটনাস্থল হিসেবে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা চিহ্নিত করা হয় এবং সেখানে ডুবুরি দল নামানো হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকেই জামিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে জামিলের রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে। ২৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি একই বাসায় বসবাস করতেন। পুলিশ তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ গোপন, সহিংসতা এবং অবৈধভাবে আটকে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সন্দেহভাজনের বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে রক্তের চিহ্নসহ সহিংসতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ভিকটিমদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে বলে সন্দেহ জোরদার হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই শিক্ষার্থীই মেধাবী এবং গবেষণায় সক্রিয় ছিলেন। তাদের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শোকাহত। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ কনস্যুলেট মিয়ামি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। মরদেহ দেশে পাঠানো, আইনি সহায়তা এবং তদন্ত অগ্রগতির বিষয়ে পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য, ঘটনার সময়রেখা এবং দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে সন্দেহভাজনের সম্পর্কের গভীরতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নাহিদা বৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ মরদেহ উদ্ধার এবং ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ উদঘাটন এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য।
এই জোড়া হত্যাকাণ্ড শুধু প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক অঙ্গনেও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













