যুক্তি ও সত্য প্রকাশের পূর্বে ফ্যালাসিস চর্চার গুরুত্ব
যৌক্তিক ভ্রান্তি মূলত যুক্তির ত্রুটি, এগুলি যৌক্তিকভাবে ভুল যুক্তি, যা রাজনীতিবিদ এবং মিডিয়া হাউসগুলি আমাদের বোকা বানানোর জন্য প্রচুর ব্যবহার করে থাকে। এগুলি মূলত তথ্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
“স্ট্র ম্যান ফ্যালাসি” হলো অন্যের যুক্তিকে বিকৃত করে সেটিকে আক্রমণ বা খণ্ডন করা । প্রতিপক্ষের আসল যুক্তির জবাব না দিয়ে, কেউ কিছুটা একই রকম কিন্তু সমান নয় এমন একটি যুক্তি উপস্থাপন করে। এটি এমন এক প্রকার যৌক্তিক ভ্রান্তি যেখানে যুক্তিকে এমনভাবে বিকৃত করা হয় যে তার পাল্টা যুক্তি দেওয়া সহজ হয়ে যায়। যুক্তিকে বিকৃত করার অনেক পদ্ধতি আছে, যেমন—যুক্তিকে অতি সরলীকরণ করা, যুক্তিকে অতিরঞ্জিত করা, অথবা যুক্তিকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
উদারনসরূপ- প্রথম ব্যক্তি- আমি মনে করি, সন্তান জন্মদানের পর প্রথম বছরে বেকার স্বামীহীন মায়েদের জন্য ভাতা বাড়ানো উচিত, কারণ তাদের সন্তানদের চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন হয়।
দ্বিতীয় ব্যক্তি- তাহলে আপনি মনে করেন যে নারীদের স্বামীহীন মা হতে উৎসাহিত করা উচিত এবং পরিশ্রমী নাগরিকদের করের টাকায় তাদের বিনা পরিশ্রমে সুবিধা ভোগ করতে দেওয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদে এটি কেবল আমাদের অর্থনীতি এবং সমাজেরই ক্ষতি করবে।
স্লিপারি স্লোপ ফ্যালাসি হলো এমন একটি যুক্তি যা দাবি করে যে একটি প্রাথমিক ঘটনা বা কাজ অন্যান্য ঘটনার একটি ধারাকে উস্কে দেবে এবং একটি চরম বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে। এই স্লিপারি স্লোপ ফ্যালাসি তার দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না দিয়েই এই ঘটনাপ্রবাহের পূর্বাভাস দেয়। এই ভ্রান্ত যুক্তিটি ভীতি ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, কোনো একটি বিষয় নিয়ে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য। যেমনটা উদাহরনে বলা হয়েছে, যা বাস্তবে এমনটা যে ঘটবে তার কোনো প্রমাণ নেই, এটি শুধুমাত্র মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।
উদারনসরূপ- প্রথম ব্যক্তি- উন্নায়নের নামে যেই ভাবে অর্থ ঋণ করা হচ্ছে তাতে কি দেশের মঙ্গল হচ্ছে?
দ্বিতীয় ব্যক্তি- ঋণ ছাড়া কিভাবে নিজ দেশের অর্থ দিয়ে দেশের উন্নায়ন সম্ভব, আজ ঋণ করেও হলেও দেশের উন্নায়ন ঘটছে না হলে তো দেশটা জঙ্গি দেশে পরিনত হবে।
পক্ষপাতদুষ্ট/ অন্তর্নিহিত প্রশ্ন ফ্যালাসি হলো এমন একটি প্রশ্ন যার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত অনুমান থাকে। একটি পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় সেটিকে নতুনভাবে না সাজিয়ে উত্তর দিলে, তা প্রশ্নটির অনুমানের সাথে একমত হওয়াকেই বোঝায়। আপনি হ্যাঁ বা না, যা-ই উত্তর দিন না কেন, যুক্তির উপসংহারটি আগেই তৈরি হয়ে যায়। এই কারণে, পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্ন করাকে একটি কারসাজিপূর্ণ, অসৎ বিতর্ক কৌশল এবং এক প্রকার যৌক্তিক ভ্রান্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্নের পেছনের উদ্দেশ্য সাধারণত উত্তরদাতাকে অপ্রস্তুত করে দেওয়া, যার ফলে তিনি হয়তো কোনো গোপন কথা প্রকাশ করে ফেলবেন, এমন কোনো বক্তব্যের সাথে একমত হবেন যা তার মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না, অথবা আত্মরক্ষামূলক হয়ে উঠবেন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবেন। পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্ন হলো এক প্রকার অনানুষ্ঠানিক যৌক্তিক ভ্রান্তি, অর্থাৎ এগুলো গঠনগত ভুলের পরিবর্তে বিষয়বস্তুগত ভুল।
পক্ষপাতদুষ্ট প্রশ্নকে কখনও কখনও নির্দেশনামূলক প্রশ্নের (directing questions) সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। পক্ষপাতদুষ্ট এবং নির্দেশনামূলক উভয় প্রকার প্রশ্নই উত্তরদাতাকে একটি নির্দিষ্ট উত্তরের দিকে পরিচালিত করে, কিন্তু এদের পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
উদারনসরূপ- “আপনি কি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে সমর্থন করবেন?” আপনার উত্তর যাই হোক না কেন, উপসংহারটি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। আর তা হলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
মিথ্যা দ্বিধাবিভক্তি ফ্যালাসি
মিথ্যা দ্বিধার ভ্রান্তি তখন ঘটে যখন কেউ কোনো বিষয়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করে, হয় কেবল দুটি বিকল্প দেখিয়ে (যদিও আরও বিকল্প থাকে) অথবা বিকল্পগুলোকে পরস্পর বর্জনীয় হিসেবে দেখানো।
যেমনটা- দেশকে বেছে নিতে হবে, উন্নয়ন অথবা ধ্বংস। ”এ” অথবা “বি”, অন্য কোনো বিকল্প নেই। এই যৌক্তিক ভ্রান্তিকে বলা হয় মিথ্যা দ্বিবিভাজন, যেখানে আপনি মানুষকে দেখান যে তাদের কাছে মাত্র দুটি বিকল্প আছে, হয় এটা অথবা ওটা।
এর আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো, হয় আপনি সন্ত্রাসীদের মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অথবা আপনি একজন সন্ত্রাসী সমর্থক। এক নজরে এটা সঠিক মনে হয়। আপনি হয় তাদের বিরুদ্ধে থাকতে পারেন অথবা তাদের সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে দুইটির বেশি বিকল্প আছে, এমনও হতে পারে যে আপনি মৃত্যুদণ্ড এবং সন্ত্রাসবাদ উভয়েরই বিরোধী।
বৃত্তাকার/চক্রাচার যুক্তি ফ্যালাসি
চক্রাকার যুক্তির ভ্রান্তি (যা চক্রাকার যুক্তি বা সার্কুলাস ইন প্রোবান্ডো নামেও পরিচিত) হলো এক প্রকার যৌক্তিক ভ্রান্তি, যেখানে কোনো যুক্তির উপসংহারটি তার কোনো একটি পূর্বানুমানের মধ্যেই ধরে নেওয়া হয়। অন্য কথায়, যুক্তিটি একটি বৃত্তে ঘোরে: এটি পূর্বানুমানকে সমর্থন করার জন্য উপসংহার ব্যবহার করে, এবং তারপর উপসংহারকে সমর্থন করার জন্য পূর্বানুমানটি ব্যবহার করে। এটি কোনো নতুন বা স্বাধীন প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।
উদাহরণ: আমাদের পণ্যটি সেরা, কারণ এটি সর্বোচ্চ মানের।
এবং আমরা জানি এটি সর্বোচ্চ মানের, কারণ এটিই সেরা।
রেড হেরিং ফ্যালাসি
রেড হেরিং ফ্যালাসি হলো কোনো আলোচনাকে তার মূল বিষয় থেকে অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। পাঠক বা শ্রোতার মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি অপ্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থাপন করে রেড হেরিং ব্যবহার করা হয়। এটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। এর ফলে, কেউ অন্যদের মনোযোগ মূল আলোচনার বিষয় থেকে সরিয়ে দিতে পারে অথবা কোনো কঠিন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যেতে পারে। রেড হেরিং ফ্যালাসি হলো এক ধরনের যৌক্তিক ভ্রান্তি বা যুক্তির ত্রুটি, যা তখন ঘটে যখন আলোচ্য মূল বিষয় বা যুক্তি থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য একটি বিভ্রান্তিকর যুক্তি বা প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। রেড হেরিং বলতে সেই তথ্যকে বোঝায় যা মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, রহস্য উপন্যাসে প্রায়শই এমন একটি চরিত্র থাকে যা সম্ভাব্য সন্দেহভাজন হিসেবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়। এক্ষেত্রে, পাঠককে ভুল পথে চালিত করতে, গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এবং একটি চমকপ্রদ সমাপ্তি উপহার দিতে রেড হেরিং একটি সাহিত্যিক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কখনও কখনও, অন্যদের প্রভাবিত করার জন্য একটি আলঙ্কারিক কৌশল হিসেবে রেড হেরিং ব্যবহার করা হয়, বা এমনকি তর্কের সময় দুর্ঘটনাক্রমেও ব্যবহৃত হয়, সেক্ষেত্রে আমরা একে রেড হেরিং ফ্যালাসি বলি। উদাহরণস্বরূপ, রাজনীতিবিদরা প্রায়শই জনসমক্ষে করা কঠিন প্রশ্ন এড়ানোর জন্য এটিকে একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে, তারা শ্রোতাদের মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো সম্পর্কহীন বিষয়ে কথা বলা শুরু করতে পারেন।
ব্যক্তি আক্রমণ ফ্যালাসি
ব্যক্তি আক্রমণ ফ্যালাসি/অ্যাড হোমিনেম শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো “ব্যক্তির প্রতি”, অর্থাৎ “ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে”। সুতরাং, একটি অ্যাড হোমিনেম যুক্তি হলো কোনো বক্তব্যের বৈধতার ওপর আক্রমণ না করে, বক্তব্য প্রদানকারী ব্যক্তির ওপরই আক্রমণ করা। সাধারণ ভাষায়, এটি ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসাবে পরিচিত। একটি অ্যাড হোমিনেম যুক্তি বা অ্যাড হোমিনেম আক্রমণের লক্ষ্য হলো কোনো বিরোধী মতকে সরাসরি আলোচনায় না এনে পরোক্ষভাবে খণ্ডন করা। আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তি সাধারণত নিজেকে রক্ষা করার প্রয়োজন অনুভব করেন এবং এর ফলে আলোচনার বিষয় থেকে সরে যান, যা অ্যাড হোমিনেম যুক্তির শক্তি প্রদর্শন করে। অ্যাড হোমিনেম ভ্রান্তি হলো একটি যৌক্তিক ভ্রান্তি, বিশেষত এটি প্রাসঙ্গিকতার একটি ভ্রান্তি, অর্থাৎ, উত্থাপিত যুক্তিটি আলোচনার জন্য অপ্রাসঙ্গিক। অ্যাড হোমিনেম ভ্রান্তি তথ্যের পরিবর্তে আমাদের আবেগ এবং পূর্বধারণাকে কাজে লাগায়।
উদারনসরূপ-
ব্যক্তি ১: আমি মনে করি ন্যূনতম মজুরি আইন প্রয়োগ করা জরুরি, যাতে শ্রমিকরা শোষিত না হয়।
ব্যক্তি ২: বাজে কথা। তুমি তো শুধু এ কথা বলছ কারণ তুমি একটা ভালো চাকরিই পাচ্ছ না!
আপনি যত বেশি এর অনুশীলন করবেন, আপনার জীবনে তত ভালোভাবে যুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন। এটি আপনার বিষয়গুলিকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা উন্নত করবে এবং আপনাকে মানুষের সাথে বিতর্ক করতে সাহায্য করবে। তাই এই যৌক্তিক ভ্রান্তিগুলো অনুশীলন করতে থাকুন।










