ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: সার সঙ্কটে বিশ্বজুড়ে নতুন খাদ্য সঙ্কটের আশঙ্কা
সার সঙ্কটের কারণে পুরো বিশ্ব এখন বড় ধরনের খাদ্য সঙ্কটের ঝুঁকির মুখে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবিঃ সংগৃহীত
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, সার সঙ্কটের কারণে পুরো বিশ্ব এখন বড় ধরনের খাদ্য সঙ্কটের ঝুঁকির মুখে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। হরমুজ প্রণালী দিয়ে গালফ অঞ্চল থেকে সার ও গ্যাস পরিবহনে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ায় একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে সার ও খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি ছুঁয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু জ্বালানির দাম বাড়াই নয়, গালফ অঞ্চলে সার উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় এর ধাক্কা আরও গভীরভাবে পড়বে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
গালফ অঞ্চল বিশ্বের মোট সার উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং ইউরিয়া সারের প্রায় ৪৬ শতাংশ যোগান দেয় বলে শিপিং বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল গ্রুপ জানিয়েছে। কাতারভিত্তিক কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানি (ক্যাফকো) একাই বিশ্বের প্রায় ১৪ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহ করে থাকে। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বব্যাপী মোট সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানে ও গালফ অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনা ও এলএনজি টার্মিনালে হামলার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক সার কারখানাই উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করেছে। কাতারে বিশ্বের বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদন স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে কাতার থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের রপ্তানি কমে যাওয়ায় ভারত তিনটি ইউরিয়া কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে এবং বাংলাদেশ পাঁচটির মধ্যে চারটি সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন কৃষি খাতও এই সঙ্কটে পড়েছে; বছরের এই সময়ে প্রয়োজনীয় সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইউরিয়া ঘাটতিতে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়া রপ্তানি মূল্য ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি টন ৫০০ ডলারের নিচ থেকে ৭০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি যদি দ্রুত কমে না, তবে বিশ্বব্যাপী সারদামের আরও বড়ো ধাক্কা আসতে পারে; ইউরিয়ার দাম দ্বিগুণ এবং ফসফেট সারের দাম অন্তত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে উন্নয়নশীল দেশসহ অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম সার ব্যবহার করতে পারেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ফসলের ফলনে।
ইউরোপে রাশিয়ান সস্তা গ্যাসের জোগান বন্ধ হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের ঘাটতি চলছে; তার ওপর চীন নিজস্ব কৃষকদের স্বার্থে ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের রপ্তানি সীমিত করেছে, ফলে সরবরাহ সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে।
ইতিমধ্যে গালফের সার আমদানিনির্ভর বড় কৃষি উৎপাদক দেশগুলো যেমন ভারত, ব্রাজিল ও চীন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ভারত তার ইউরিয়া ও ফসফেট সারের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, আর ব্রাজিল প্রায় পুরো সারণ সরবরাহেই আমদানিনির্ভর, যার অর্ধেকের মতোই হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, সার সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হলে ধান, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে, যার ফলে বৈশ্বিক বাজারে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে এবং আমদানিনির্ভর দরিদ্র দেশগুলোতে স্থানীয় খাদ্য সঙ্কট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
একজন সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষক আল জাজিরাকে বলেছেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে ঝুঁকি থেকে যাবে; সরাসরি অবরোধ না থাকলেও ড্রোন হামলার আশঙ্কা থাকায় অনেক জাহাজই চলাচলে অনিচ্ছুক। তার ভাষায়, পরিবহন ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে বলেই জ্বালানি ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উচ্চ পর্যায়ে আটকে থাকতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দেবে এবং খাদ্যদ্রব্যের উপর চাপ আরও বাড়াবে
সুত্রঃ আল জাজিরা













