শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

ইউরোপের মঞ্চে বাংলা আর মার্টিনসের মঞ্চে অভিবাসী বিজয়

পর্তুগাল প্রতিনিধি প্রকাশিত: রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
ইউরোপের মঞ্চে বাংলা আর মার্টিনসের মঞ্চে অভিবাসী বিজয়

ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজধানী লিসবনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবার যেন নতুন ইতিহাস লিখল বাংলা ভাষা ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম। পর্তুগালের খ্যাতনামা পরিচালক মার্কো মার্টিনসের মঞ্চনাটক Um Inimigo do Povo–তে একদিকে যেমন উঠে এসেছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের বিতর্কিত পুলিশ অভিযানের চিত্র, অন্যদিকে তেমনি ফুটে উঠেছে বাংলাদেশি ও নেপালি অভিবাসীদের না বলা জীবনের গল্প।

এই নাটকে অংশ নেওয়া ১২ জন শিল্পীর মধ্যে ৭ জনই বাংলাদেশি নাগরিক সোহেল রানা, রাজিব আল মামুন, কামাল সরদার, সাবেরা পারভিন, সরকার নাসরিন, কামাল চৌধুরী ও নুরুল আমিন। তাদের সঙ্গে আছেন নেপালের দুই শিল্পী দিল বাহাদুর ও নিরাজ ঘাটকা এবং পর্তুগিজ অভিনেতা রদরিগো থমাস, রিতা কাবাকো ও জানেট ফার্নান্দেজ। পুরো মঞ্চজুড়ে বাংলা সংলাপ ও বাংলা গান যখন ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন পর্তুগিজ দর্শকেরা অবাক বিস্ময়ে, কখনও বা অশ্রুসজল চোখে পুরো প্রদর্শনী উপভোগ করেছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এটি নিঃসন্দেহে এক গৌরবময় মুহূর্ত, যা ইতোমধ্যে পর্তুগালের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছে।

নাটকের প্রেক্ষাপটে আছে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর লিসবনের রুয়া দো বেনফরমোসোতে পরিচালিত বিশেষ পুলিশ অভিযান। ওই দিন প্রায় ৪০০ জন অভিবাসীকে দেয়ালের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাত মাথার ওপর তুলে রাখতে বাধ্য করা হয় এবং এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পর্তুগালজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসী সংগঠনগুলো এটিকে বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক আচরণ হিসেবে আখ্যা দিলেও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে শুরুতে এটিকে “অপরাধ দমনমূলক বিশেষ অভিযান” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পরবর্তীতে পর্তুগালের  প্রোভেদোরিয়া দা জুস্তিসা এই অভিযানে পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত তল্লাশির ক্ষেত্রে গুরুতর ত্রুটির কথা উল্লেখ করলেও, তা জনমতের সেই প্রথম ধাক্কার তুলনায় অনেক কম আলোচনায় আসে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

এই এক টুকরো ছবি দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের দৃশ্য মার্কো মার্টিনসকে নাড়া দেয়। নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের ক্লাসিক An Enemy of the People–এর উপর ভিত্তি করে তিনি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন, কীভাবে মিডিয়া ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো অভিবাসীদের কণ্ঠস্বর না শুনেই তাদের “সমস্যা” বা “হুমকি” হিসেবে তুলে ধরে। পরিচালক নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের কাছে পৌঁছে যায় পরোক্ষভাবে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ আর রাজনৈতিক প্রচারণার মাধ্যমে যেখানে অভিবাসীর নিজস্ব কণ্ঠ প্রায় অনুপস্থিত।

মার্টিনসের ভাষায়, এই অভিবাসীরা “কখনও শোনা যায় না, কখনও মঞ্চ পায় না, কখনও তাদের পরিচয় দৃশ্যমান হয় না।” দক্ষিণ এশীয়দের একঘাটে “ইন্ডিয়ান” বলে ডাকার ধরনটিকে তিনি তুলনা করেছেন যেন আইবেরিয়ান উপদ্বীপের সব মানুষকে এক নামে ডেকে তাদের ব্যক্তিত্ব মুছে ফেলার সঙ্গে। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন প্রান্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা এই পরিচালক মনে করেন, এ ধরনের সম্বোধন মূলত এক ধরণের অমানবিকীকরণ যেখানে মানুষকে আলাদা ব্যক্তিত্ব নয়, এক ধরনের বিমূর্ত “অন্য” হিসেবে দেখা হয়।

ইবসেনের মূল নাটকে একটি নরওয়েজিয়ান শহরের থার্মাল স্পা ও জনস্বার্থ অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির সত্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের সংঘাত উঠে এসেছে। মার্টিনস এই সংঘাতকে টেনে এনেছেন আজকের ইউরোপে অভিবাসন বিতর্কের প্রেক্ষাপটে। তার মতে, “নাটকের বড় লাইনটি হল সংখ্যাগরিষ্ঠ কখনই সব সময় সঠিক নয়; অনেক সময় সত্যের কাছাকাছি থাকে সেই সংখ্যালঘুরাই, যাদের কথা শোনা হয় না।” যদিও তিনি ‘সত্য’ শব্দটিকে আপেক্ষিক বলেই দেখেন, তবু এই নাটকের মাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন কাদের অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি, আর কাদের কথা চেপে রাখছি?

এখানে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দ্বন্দ্বের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের ভূমিকা। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিশেষ করে অতি ডানপন্থী ও জনপ্রিয়তাবাদী শক্তি, যেভাবে অভিবাসীদের ওপর বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার দায় চাপিয়ে নিজেদের ভোট রাজনীতি সাজায়, সেটাও নাটকের অনুষঙ্গ। পরিচালক বলেছেন, তার কাজ সরাসরি “অ্যাক্টিভিজম” নয়, বরং প্রশ্ন তোলা ও দ্ব্যর্থক মনে হওয়া বিষয়গুলোকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সামনে আনা যাতে দর্শক নিজের মতো করে ভাবতে বাধ্য হয়।

নাটকের আরেকটি দিক হলো, বেনফরমোসোর ওই অভিযানে দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রায় কয়েক ডজন অভিবাসীর মধ্য থেকে অন্তত একজন সরাসরি এই নাটকের অংশ হয়েছেন। অন্যদের ক্ষেত্রেও, পরিচালক মনে করিয়ে দেন তারা শারীরিকভাবে হয়তো সেদিন সেই দেয়ালে ছিলেন না, কিন্তু তাদের জীবন, ভয় ও অভিজ্ঞতা সেই একই বাস্তবতার অংশ; সামান্য সময় ও জায়গার ব্যবধানে যে কেউ সেই সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন।

মার্কো মার্টিনসের এই কাজের পেছনে রয়েছে পর্তুগালের শীর্ষ দৈনিক এক্সপ্রেসো এর দুই সাংবাদিক জোয়ানা পেরেইরা বাস্তোস ও রাকেল মোলেইরোর অনুসন্ধানী রিপোর্টিং। বেনফরমোসোর সেই অভিযানে যাদের আটকানো হয়েছিল, তাদের খুঁজে বের করা ছিল দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া; কারণ একদিকে রয়েছে ভয় ও অবিশ্বাস, অন্যদিকে রয়েছে “বাংলাদেশ নয়” লেখা পোস্টারসহ কিছু রাজনৈতিক প্রচারণা, যা অভিবাসীদের সরাসরি লক্ষ্য করে তাদের “সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেকের পরিবার বাংলাদেশে বসে আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেলে এই অভিযান দেখেছেন এবং দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা আপনজনকে দেখে তাকে অপরাধীর সঙ্গে এক কাতারে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন; পরে সেই ব্যক্তি বারবার ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হয়েছেন যে তিনি কিছুই করেননি।

সাংবাদিকদের ভাষ্যমতে, অভিবাসীদের জীবনকাহিনি তুলে ধরতে গিয়ে শুধু পর্তুগালে এসে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তা নয়, বরং নিজ দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রাপথের বর্ণনা উঠে এসেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেছে পর্তুগালে বাংলাদেশি  কমিউনিটির কয়েকজন  সদস্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের ডকুমেন্টেশন ও আইনি সহায়তা নিয়ে কাজ করছেন। নারী সাংবাদিক হিসেবে এই সংবেদনশীল সম্প্রদায়ের ভেতরে প্রবেশ করাও সহজ ছিল না; সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও ছিল একটি বাড়তি বাধা।

​

এমন একটি প্রেক্ষাপটে লিসবনের সেন্ট্রো কালচুরাল দে বেলেঁ (CCB)–এর মতো মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অভিবাসীদের কণ্ঠ, মুখ, ভাষা—সবকিছুকে সামনে আনা পর্তুগালের গণতান্ত্রিক সমাজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। শো শেষে পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছেন দর্শকেরা; অনেকেই বলেছেন, থিয়েটার থেকে বেরিয়ে তারা আর আগের মতো নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন না।

লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোযে মাপ্রিল এই নাটককে পর্তুগালে অভিবাসীদের দীর্ঘদিনের ভুল উপস্থাপন আর স্টেরিওটাইপের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী শিল্পিত জবাব হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, অসমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অভিবাসীদের এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বিশেষভাবে প্রশংসনীয়, কারণ এটি সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান না হয়ে, গভীর মানবিক অভিজ্ঞতার ভাষায় কথা বলে।

পর্তুগালের প্রধান জাতীয় দৈনিক এক্সপ্রেসো  এর উপ সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক ডাভিদ দিনিস বলেছেন, Um Inimigo do Povo নিঃসন্দেহে এক অনন্য উপস্থাপনা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের দুর্দান্ত উদাহরণ। তিনি সব শিল্পী ও কলাকুশলীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, পর্তুগাল ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের সাংস্কৃতিক সংলাপই বর্তমান ইউরোপীয় সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজন।

পরিচালক মার্টিনস আশা করছেন, উনিশ শতকের নরওয়ে থেকে অনেক দূরের এই পর্তুগিজ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইবসেনের নাট্যবস্তুর পুনর্নির্মাণ দর্শকদের “অস্থির” করে তুলবে। তার কাছে থিয়েটার শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; বরং সহানুভূতি ও সমবেত চিন্তার একটি বিশেষ স্থান, যেখানে দর্শকরা ভাবতে শুরু করবেন যে মানুষটি আমাদের খাবার ডেলিভারি করে, বাস চালায় বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করে, তার জীবন সম্পর্কে আমরা আসলে কতটা জানি।

বর্তমানে এই নাটকটি পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে মঞ্চায়িত হচ্ছে এবং আসন্ন মাসগুলোতে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে ট্যুর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে যেমন একদিকে ইউরোপীয় থিয়েটারের মূলধারায় বাংলা ভাষা, বাংলা গান ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জীবনকাহিনি আরও বেশি দৃশ্যমান হবে, অন্যদিকে অভিবাসী অধিকারের প্রশ্নটি নতুন আলোচনার জন্ম দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা রক্ষায় সেনা পাঠাচ্ছে ফ্রান্স

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৭ পিএম
সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা রক্ষায় সেনা পাঠাচ্ছে ফ্রান্স

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি মিলিশিয়ার হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। তবে এই সামরিক মোতায়েন কোনো সংঘাতে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সৌদির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্যারিস।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই দিন দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুর জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় ফ্রান্স সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে বলে জানান তিনি।

সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স ২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাক্রোঁ বলেন, কোনো সংঘাতে জড়ানোর জন্য নয়, বরং জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পাঠানো হবে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সৌদি আরবকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ম্যাক্রোঁ জানান, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের বাজারে গ্যাসের দাম কমাতে ফ্রান্স বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সৌদি আরবে সামরিক সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্তও সেই উদ্যোগের অংশ।

চলমান সংঘাতের প্রভাবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের মিত্র হুথি মিলিশিয়া সৌদি আরবে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার কারণে লোহিত সাগরসংলগ্ন বন্দরগুলো থেকে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আবারও সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেওয়ার প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষায় সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিল ফ্রান্স।

এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি, কাটছে গ্যাস সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:০৯ পিএম
এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি, কাটছে গ্যাস সংকট

বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে কার্গো জাহাজ থেকে ভাসমান টার্মিনালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি খালাস আবার শুরু হয়েছে। এতে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে শিগগিরই দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মহেশখালীতে এলএনজি খালাসের কাজ পুনরায় চালু হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরবরাহে এর প্রভাব দেখা যায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টা নাগাদ এলএনজি থেকে প্রায় ৭৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। একই সময়ে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যায় প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। সব মিলিয়ে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ২৩৪ কোটি ঘনফুট।

এর আগে বঙ্গোপসাগরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে এলএনজি সরবরাহে হঠাৎ বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ইন্দোনেশিয়া থেকে এলএনজি নিয়ে আসা ‘প্যাসিফিক সাকসেস’ নামের একটি কার্গো জাহাজ বৃহস্পতিবার মহেশখালীতে পৌঁছালেও উত্তাল সাগরের কারণে সেটি থেকে সামিটের ভাসমান টার্মিনালে গ্যাস স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ফলে একটি টার্মিনাল থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছিল। একপর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুটে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

চাহিদার তুলনায় এখনো ঘাটতি

পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার সেই সরবরাহ কমে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়।

দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আমদানিকৃত এলএনজি থেকে আসে। মহেশখালীর সমুদ্র এলাকায় থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় পাইপলাইনে পাঠানো হয়। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি সামিট গ্রুপের।

দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক সর্বোচ্চ সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে কার্গো থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থায় দ্রুত প্রভাব পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি টার্মিনালে মজুত এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কার্গো মহেশখালীতে পৌঁছে গেলেও সাগরের পরিস্থিতির কারণে সেটি থেকে এলএনজি খালাস করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে যে পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাওয়ার কথা, তার তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

শুক্রবার সকালে আবহাওয়ার উন্নতি হলে আবার কার্গো থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বাড়তে থাকে।

এর আগে জুলাইয়ে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পরও দেশে বড় ধরনের গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছিল। প্রায় এক মাস পর আগস্টে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হয়। এরপর এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও কিছুটা উন্নত হচ্ছিল।

এর মধ্যেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন করে এলএনজি খালাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহে আবার চাপ তৈরি হয়। শুক্রবার সকালে খালাস পুনরায় শুরু হওয়ায় সেই পরিস্থিতি আপাতত কাটতে শুরু করেছে। তবে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো কম থাকায় গ্যাসের ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে আমদানি ও এলএনজি খালাস নিয়মিতভাবে চালু থাকার ওপর।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চড়া হয়েছে সবজির দাম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫৫ পিএম
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চড়া হয়েছে সবজির দাম

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানীর খুচরা বাজারে বেশ কিছু সবজির দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেগুন, করলা, পটল, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙা ও ধুন্দলসহ বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামরিচ ও টমেটোর দামও ঊর্ধ্বমুখী।

শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারভেদে লম্বা বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং কোথাও কোথাও ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও একই ধরনের বেগুন ৯০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিল।

করলা এখন মানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে উঠেছে। ঝিঙা ও ধুন্দলের ক্ষেত্রেও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে। কাঁচা পেপের দাম অবশ্য আগের মতোই প্রায় ৩০ টাকা কেজি রয়েছে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

বাজারে সবজির পাশাপাশি মাছের দামেও কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। আকারভেদে রুই মাছ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পাঙ্গাস ২২০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে সব পণ্যের দাম বাড়েনি। ফার্মের ডিম, ব্রয়লার ও অন্যান্য মুরগির দাম মোটামুটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে। বাজারভেদে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি প্রায় ৩২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দাম সামান্য বাড়লেও বাজারে তা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা ডজনের মধ্যে রয়েছে। চালের দামেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় কোনো প্রভাব এখনো দেখা যায়নি।

পরিবহন খরচের প্রভাব, নাকি বাড়তি মুনাফা?

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। যশোর থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সবজি পরিবহনের উদাহরণ দিয়ে এক ব্যবসায়ী জানান, আগে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকের ভাড়া প্রায় ১৮ হাজার টাকা থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর তা বেড়ে ২১ হাজার টাকার কাছাকাছি হয়েছে। এতে বেগুনসহ অন্যান্য সবজির পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দর কার্যকর হয় ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। এর আগে চলতি বছর এপ্রিল ও জুনেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর পাইকারি বাজার পর্যন্ত পণ্য আনতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। সেই ব্যয়ের একটি অংশ খুচরা মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহন ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় অনেক পণ্যের দাম খুচরা বাজারে বেশি হারে বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব থাকলেও একবারে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর যৌক্তিকতা সব ক্ষেত্রে নেই। বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

এদিকে দুধ, আটা ও ময়দার দামেও সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও একই পরিমাণ দাম বাড়িয়েছিল। পাশাপাশি দুই সপ্তাহ আগে সরবরাহকারী কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আটা ও ময়দার দামও বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। প্রতি লিটারে প্রায় চার টাকা বাড়ার পর দুই লিটারের একটি বোতল এখন ৪০৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দরের প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যয়কে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বললেও ক্রেতারা বলছেন, বাজারে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে খুচরা পর্যায়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

প্রবাহ বাংলা নেটওয়ার্ক