চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’, মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছবি: সংগৃহীত
চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট তথ্য ও দায়ীদের তালিকা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতি কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা যাওয়ার পরই ডিজিএফআই, এনএসআই, পুলিশ সদর দপ্তর ও বিশেষ শাখাসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা রাজধানীসহ সারাদেশে চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের তথ্য সংগ্রহে নামেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তারা সরেজমিনে গিয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য নিচ্ছেন; নেপথ্যের গডফাদার থেকে শুরু করে চাঁদা আদায়ে জড়িত সব ব্যক্তির হালনাগাদ তালিকা যত দ্রুত সম্ভব চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত জানিয়েছে দায়িত্বশীল মহল।
‘যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় নয়’
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানান, চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থান হলো ‘জিরো টলারেন্স’। তার ভাষায়, চাঁদাবাজির সঙ্গে যতো বড় প্রভাবশালীই যুক্ত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, আইনের আওতায়ই আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পরই দেশের সব ইউনিটকে সতর্ক করা হয়েছে, তথ্যভিত্তিক তালিকা হাতে এলেই বড় পরিসরে অভিযান শুরু হবে।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের কোনো দল নেই; নিজেদের স্বার্থে তারা যেকোনো সময় রাজনৈতিক দলের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে। পূর্বের তৈরি তালিকাগুলোর সঙ্গে নতুন করে সংগ্রহ করা তথ্য মিলিয়ে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে, যাতে কেউ গা–ঢাকা দিয়ে থাকা অবস্থায়ও পার পেয়ে না যায়। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামসহ কয়েকটি জেলায় পুলিশ ও যৌথবাহিনী অভিযান শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া চাঁদাবাজি
এক প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য জানান, ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চাঁদাবাজ চক্রগুলো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নগরীর বড় বড় বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘কমিটি’, ‘সংগঠন’, ‘সংঘ’ ইত্যাদি নাম ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রতিটি বাস থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ এসেছে।
গোয়েন্দাদের তথ্যে আরও জানা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে একটি চক্র সারাদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজধানীর সড়ক, ফুটপাত, হকারদের দোকান, এমনকি নদীর বালুমহাল পর্যন্ত অবৈধভাবে দখল করে তারা বছরে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে। শুধু গুলিস্তান এলাকাতেই বার্ষিক চাঁদাবাজির অঙ্ক অন্তত ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
এসব অবৈধ দখলদারি ও চাঁদা আদায়কে ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’-এর বড় উৎস হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাদের মতে, নিম্নআয়ের হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর এর চাপ সরাসরি পড়ে, আর তারা নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের কারণেই বাধ্য হয়ে চাঁদা দেয়।
টিটু–সুফিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তবু পুলিশি ব্যবস্থা নেই
রাজধানীর পল্টন ও গুলিস্তান এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে দখলদারি ও চাঁদাবাজির পেছনে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে একটি অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন টিটু এবং তার ঘনিষ্ঠ আবু সুফিয়ানের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও শাহবাগ থানাধীন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু দলীয় শাস্তি সত্ত্বেও টিটু–সুফিয়ানদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো পুলিশি ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির ‘ছায়া’ পেয়ে আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা জানান, তাদের গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই দলীয়ভাবেই টিটু–সুফিয়ানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সমান গুরুত্ব না দেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হকারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত টাকা আদায় করা হচ্ছে; যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, তাদের পসরা গুছিয়ে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে অভিযান ও আগাম পদক্ষেপ
চাঁদাবাজি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করা একটি গোয়েন্দা ইউনিটের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ তালিকা’ চাওয়া হওয়ায় এবার আগে থেকে থাকা সাধারণ অভিযোগ নয়, বরং প্রমাণ–সহ শক্তিশালী ডসিয়ার তৈরি করা হচ্ছে। কোন এলাকায় কত টাকা, কোন নামে, কার মাধ্যমে এবং কার আশ্রয়ে চাঁদা আদায় হচ্ছে—এসব তথ্য নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা ও পুলিশ উভয় সংস্থার ধারণা, সব তথ্য যাচাই–বাছাই শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সব বাহিনীপ্রধানকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করবেন। সেই বৈঠকের পরই সারা দেশে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সমন্বিত ও বড় ধরনের অভিযান শুরু হতে পারে।
সরকার–ঘনিষ্ঠ নীতি–নির্ধারকের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। এজন্য ‘যত বড়ই হোক, চাঁদাবাজদের কোনো ছাড় নেই’—এই বার্তাই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে চান প্রধানমন্ত্রী।










