মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় অনিশ্চয়তায় প্রবাসী আয়, প্রবাসী রেমিট্যান্স অনিশ্চিত
ছবি: এআই প্রবাহ বাংলা
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলা এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং অনেক অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত হয়ে যেতে পারে। এর ফলে শ্রমবাজারে সংকোচন দেখা দিতে পারে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর। চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া কিংবা বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন অনেকেই।
প্রবাসীদের নীরব সংগ্রাম
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থানের আশায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যান। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি কিংবা ঋণ পরিশোধের আশায় অনেকেই বিদেশমুখী হন। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকা, ভিন্ন পরিবেশে কাজ করা এবং অনিশ্চিত কর্মপরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করা তাদের জন্য মানসিক চাপেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিদেশে শ্রম অভিবাসনের এই প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক লাভ থাকলেও এর একটি বড় সামাজিক মূল্য রয়েছে। পরিবার বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক সম্পর্কের দূরত্বের মতো বিষয়গুলো সাধারণত পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়।
বর্তমানে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাদের আয়ের ওপর নির্ভর করছে দেশের অসংখ্য পরিবার।
শ্রমবাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্ব রাজনীতির উত্তেজনা যখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে রূপ নেয়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সেখানকার অর্থনীতিতে। তেলসমৃদ্ধ এসব দেশে সাধারণত বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, নির্মাণ খাত এবং সেবাখাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেন।
কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সরকারগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের বদলে সামরিক ব্যয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে এবং অনেক প্রকল্প স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের শ্রমিকরা, যারা নির্মাণ, পরিবহন বা সেবাখাতে কাজ করেন।
দেশে ফেরার ঝুঁকি
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অনেক প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে পারেন। কিন্তু দেশে ফিরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, হঠাৎ বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশে ফিরে এলে শ্রমবাজারে চাপ বাড়বে। ইতোমধ্যে বিদ্যমান বেকারত্বের সঙ্গে যুক্ত হবে বিদেশফেরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন।
এছাড়া বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পারার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অনেক শ্রমিক দালাল বা নিয়োগ সংস্থার মাধ্যমে ঋণ নিয়ে বিদেশে যান। চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরলে সেই ঋণের বোঝা আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।
রেমিট্যান্সে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হলো এই রেমিট্যান্স।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ফলে এই অঞ্চলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব পড়তে পারে।
রেমিট্যান্স কমে গেলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক প্রভাব
প্রবাসীরা শুধু পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান না, গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশও তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবার সম্পূর্ণভাবে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে।
যদি সেই আয় কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বহু পরিবার নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বীমা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তার মতে, অনেক প্রবাসী শ্রমিকই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারকে এখন থেকেই বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে হবে। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আপাতদৃষ্টিতে দূরের কোনো আন্তর্জাতিক ঘটনা মনে হলেও বাস্তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।










