ইরান–যুদ্ধে ট্রাম্পের ‘কম খরচের’ হিসাব ভেঙে পড়ার শঙ্কা
বিদেশে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল ধারণা ছিল—এমনভাবে অভিযান চালানো হবে, যাতে খুব কমসংখ্যক মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও সীমিত প্রভাব পড়ে। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রথম দিকের ঘটনাবলি ইতিমধ্যে সেই ধারণাকে গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরানে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো সরাসরি হামলার মুখে পড়েছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং জ্বালানি–বাজারে গ্যাসসহ জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে; প্রতি দিন লক্ষ লক্ষ ডলার যুদ্ধব্যয়ে গুনছে ওয়াশিংটন।
ইরানে বেসামরিক প্রাণহানি ও যুদ্ধের বিস্তার
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্বিচার বিমান হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন প্রাথমিকভাবে বলছে, এই হামলার জন্য কে বা কারা দায়ী, তা নিয়ে তদন্ত চলছে; তবে মার্কিন নিজস্ব অনুসন্ধানেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হামলাটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রেরই এক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন স্থল সেনা ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি, কিন্তু হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন—দুই পক্ষই ভবিষ্যতে স্থলবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করছে না। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, এই সংঘাত ‘খুব দ্রুত শেষ হওয়ার মতো কিছু নয়’; বরং তাঁর ভাষায়, ‘আমরা গতি কমাচ্ছি না, বরং আরও বাড়াচ্ছি’, এবং নতুন করে আরও বোমারু বিমান ও যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে এসে পৌঁছাচ্ছে।
ট্রাম্পের আগের ‘দ্রুত সাফল্য’ আর বর্তমান বাস্তবতা
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অঙ্গনে দ্রুত ও সীমিত পরিসরের একাধিক অভিযানকে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের হিসেবে—ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় লক্ষ্যভিত্তিক হামলা, ইয়েমেনে হুতি যোদ্ধাদের ওপর আঘাত, ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহজনক মাদকবাহী নৌযান ধ্বংস, এবং ইরাক–নাইজেরিয়া–সোমালিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে বোমা হামলা—এসব অপারেশন দ্রুত এবং তুলনামূলক কম খরচে শেষ করা সম্ভব হয়েছে। ট্রাম্প শিবিরের দাবি, এসব অভিযানে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি ও অর্থব্যয় ছিল ‘স্বল্পমাত্রার’ এবং রাজনৈতিক–কূটনৈতিক ফল তাদের পক্ষে গিয়েছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সর্বশেষ আগ্রাসন সে অর্থে ‘দ্রুত শেষ হওয়া’ কোনো মিশন হয়ে উঠছে না—এমন আশঙ্কা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে যদি ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের লক্ষ্য স্থির করে থাকে, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা।
‘অনন্ত যুদ্ধের পথে’ যুক্তরাষ্ট্র?
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা জ্যাসন ক্রো নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন আবারও ‘অনন্ত যুদ্ধের পথে’ পা বাড়াচ্ছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করা এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প নিজেই একসময় সেই ‘অন্তহীন যুদ্ধের’ বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, আবারও যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে ‘লাখো কোটি ডলার খরচ, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি, কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত এবং পুরো এক প্রজন্মের যুদ্ধ–অভিজ্ঞতা’ যুক্ত হবে—যা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প এক বিবৃতিতে ইরানের জনগণকে নিজেদের দেশের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিজেদের হাতে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বটে, তবে তিনি সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সশস্ত্র শক্তিকে সরাসরি সমর্থন দেননি। এ পর্যন্ত কুর্দি নেতাদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে, কিন্তু ইরানি সরকারকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনায় ট্রাম্প রাজি হননি বলেই হোয়াইট হাউসের দাবি।
‘কম খরচে দ্রুত বিজয়’–এর স্বপ্ন ভাঙছে?
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক গবেষণা সহযোগী জন হফম্যান মনে করেন, ট্রাম্প মূলত ‘কম খরচে চমকপ্রদ বিজয়’ পছন্দ করেন। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলা–অভিযানের পর ট্রাম্প বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং নিজেকে অনেকটা ‘ধরাছোঁয়ার বাইরে’ ভেবেছিলেন—কারণ স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মৌলিকভাবে ভিন্ন; এখানে যুদ্ধব্যয় ও মানবিক খরচ দুটোই দ্রুত বাড়ছে, যা ট্রাম্পের প্রাথমিক হিসাবকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
হফম্যান উল্লেখ করেছেন, ইরান–সংঘাতের শুরুতেই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেখা দিচ্ছে; তাঁর ভাষায়, ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে এবং সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এই বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের ‘কম খরচে যুদ্ধ’ ধারণার সঙ্গে যায় না এবং দেশীয় রাজনীতিতেও তা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
‘উচ্চ লাভ বনাম উচ্চ ঝুঁকি’–র দ্বন্দ্ব
মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস–এর জ্যেষ্ঠ ফেলো এলিয়ট আব্রামস ইরানে কড়া সামরিক অভিযানকে এখনো ‘লাভজনক বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা ভেঙে ফেলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। আব্রামস বলেন, এ পর্যন্ত যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে—যেমন মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি—তা ‘দুঃখজনক’ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ‘লাভের পরিমাণ বেশি’ হতে পারে; কারণ, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী চার দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার চেষ্টা চালিয়ে আসছে এবং কখনো কখনো তাতে সফলও হয়েছে।
তাঁর মতে, যদি ট্রাম্প স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যেতে পারেন, তাহলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি সীমিত রাখা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত বা অন্তত তাদের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূল করা গেলে, শেষ পর্যন্ত তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে। আব্রামসের ভাষায়, এমনকি যদি শাসকগোষ্ঠীর কিছু অংশ ক্ষমতায় থেকে যায়, তবুও তাদের হাতে কার্যকর পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প বা আঞ্চলিক ক্ষমতা প্রদর্শনের সক্ষমতা থাকবে না—এটিই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অস্থিতিশীল ইরান: আরও বড় বিপদের আশঙ্কা
অন্যদিকে জন হফম্যান মনে করেন, ইরানের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা রাখা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, যদি বিচ্ছিন্নতাবাদী জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করা হয় এবং পরিকল্পিতভাবে ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে দুর্বল করার চেষ্টা চালানো হয়, তাহলে তা শুধু নজিরবিহীন মাত্রার ‘ছায়া যুদ্ধ’–এর জন্ম দেবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আগুনে ঠেলে দেবে।
হফম্যান সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক শরণার্থীপ্রবাহ শুরু হতে পারে, আইএসআইএস–এর মতো সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর জন্য আবারও ‘সময় ও স্থান’ তৈরি হয়ে যেতে পারে—কারণ এ ধরনের গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা ও ক্ষমতাশূন্যতা থেকে লাভবান হয়। তাঁর ভাষায়, ‘আপনারা আসলে অশান্তির এক বিশাল ঝাঁপি খুলে দিচ্ছেন’, যার মাশুল দিতে হবে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, পুরো অঞ্চলকেও।













