দেশজুড়ে সক্রিয় ৩ হাজার অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজির দাপটে জিম্মি ব্যবসায়ীরা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম—প্রায় সর্বত্রই এখন চাঁদার দাবিতে হামলা, গুলি এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বোরকা পরে ছদ্মবেশে হামলা এবং পুলিশি পাহারার মধ্যেও ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রাজধানীর ‘হটস্পট’ মোহাম্মদপুর ও বসিলা
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও বসিলা এলাকায় গত কয়েক সপ্তাহে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে এক সমন্বয়কের ওপর বোরকা পরিহিত সন্ত্রাসীর অতর্কিত হামলার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এছাড়া আদাবরের একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় ঢুকে চাঁদা না পেয়ে ৩ জন কর্মচারীকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে বসিলায়, যেখানে এক দোকান কর্মচারীকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, “ব্যবসা করবো না কি সন্ত্রাসীদের টাকা দেব? প্রতিবাদ করলে জীবন যায়, আর মুখ বুজে থাকলে পুঁজিখাটানো দায় হয়ে পড়েছে।”
চট্টগ্রামে পুলিশি পাহারায় হামলা: জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় তার বাসায় দফায় দফায় গুলি চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই ব্যবসায়ী আগে থেকেই পুলিশি নিরাপত্তার অধীনে ছিলেন। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এটি কেবল একক কোনো হামলা নয়, বরং পুরো ব্যবসায়ী সমাজকে দেওয়া একটি ‘ভয়াবহ বার্তা’।
পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য: ৩ হাজার সশস্ত্র সন্ত্রাসী মাঠে
পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩,০০০ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে:
- ঢাকা: ৪০১ জন (১৫ জন চিহ্নিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’)।
- চট্টগ্রাম: ৩৩০ জন।
- অন্যান্য জেলা: বাকি অংশ।
ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ফুটপাত, কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত কোথায় কারা চাঁদা তুলছে, তাদের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের ভূমিকা
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এই ধরনের চাঁদাবাজি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া অসম্ভব। তিনি বলেন, “যদি রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে প্রকৃত অপরাধীদের ধরা না হয়, তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।” এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “তালিকায় নাম থাকা কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না।”
ব্যবসায়ী মহলের দাবি
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে এই চাঁদাবাজি আরও বাড়তে পারে। দ্রুত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা না হলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ:
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (ডিজিএফআই, এনএসআই) সমন্বিতভাবে এই তালিকা যাচাই করছে। খুব শীঘ্রই দেশব্যাপী একটি বড় ধরনের বিশেষ অভিযান বা ‘সাঁড়াশি অভিযান’ শুরু হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।










