ইতালি উপকূলে ভূমধ্যসাগরে আবার লাশের মিছিল
ইতালির বিভিন্ন উপকূলে ভেসে আসছে অন্তত ১৫ মরদেহ, সেন্ট্রাল রুটে নতুন করে কয়েক শ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজের আশঙ্কা।
গত কয়েকদিনে ইতালির বিভিন্ন উপকূলে ভেসে আসা অন্তত ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া এসব মরদেহ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতালির সিসিলি ও দক্ষিণাঞ্চলীয় কালাব্রিয়ার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন অংশ থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, শীতকালীন ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল সাগরে গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নৌকা ডুবির এক বা একাধিক ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
কালাব্রিয়ার সমুদ্রসৈকত শহর ত্রোপিয়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রথম একটি মরদেহ দেখতে পান বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা না গেলেও তার পরনে কমলা রঙের লাইফ জ্যাকেট ছিল, যা বহু সময় সমুদ্রপথে যাত্রাকারী অভিবাসীদের ব্যবহৃত জ্যাকেটের ধরনের সঙ্গেই মিলে যায়। একই এলাকায় পরিচয়পত্রবিহীন এক নারীর মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য নৌকাডুবির উৎস অনুসন্ধানে প্রসিকিউটররা তদন্ত শুরু করেছেন।
ইতালির ছোট দ্বীপ পান্তেলেরিয়াসহ আরও কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায়ও একই সময়ে একাধিক মরদেহ ভেসে এসেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসন রুটটি বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচিত। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এই রুটে আবহাওয়া ছিল বিশেষভাবে প্রতিকূল; প্রবল ঢেউ, তীব্র শীত ও ঝড়ো হাওয়া একসঙ্গে থাকায় নৌযান চলাচলের জন্য সমুদ্র অনিরাপদ হয়ে ওঠে। তবু লিবিয়া ও টিউনিশিয়ার উপকূল থেকে পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী সমুদ্র অনুপযোগী, পুরোনো এবং ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী বোঝাই নৌকায় করে যাত্রা করেন।
ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারকাজে সক্রিয় এনজিও ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, চলতি শীত মৌসুমেই কয়েক শ মানুষ নৌকাডুবিতে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। উদ্ধারকার্যে অংশ নেওয়া কোস্ট গার্ড, বেসামরিক মাছধরা ট্রলার ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জাহাজ বহু সময় দুর্ঘটনার পর শুধু মরদেহই উদ্ধার করতে পারছে, জীবিত কাউকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা–আইওএম–এর সর্বশেষ ধারণা অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের শুরুতেই, অর্থাৎ জানুয়ারিতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে কয়েক শ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের সমন্বিত বিশ্লেষণ থেকে ২৬ জানুয়ারি সংস্থাটি জানায়, জানুয়ারির ২৩ ও ২৫ তারিখে অন্তত তিনটি পৃথক নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে এবং এসব দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইওএম-এর হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অন্তত এক হাজার ৩৪০ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের সমুদ্রপথে ডুবে বা নিখোঁজ হওয়া মানুষের সংখ্যা ৩৩ হাজারেরও বেশি, যা আধুনিক সময়ের এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে।
শিশু ও নারীদের ঝুঁকি এই রুটে সবচেয়ে বেশি বলে সতর্ক করেছে শিশু অধিকার সংগঠনগুলো। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ জানুয়ারিতে এক বিবৃতিতে বলেছিল, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় যারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তারা এখনও প্রাণঘাতী ও বিপজ্জনক এই যাত্রার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
ইতালিসহ ইউরোপের উপকূলে বারবার ভেসে আসা অসংখ্য অচেনা মরদেহ সেই ঝুঁকির নির্মম প্রমাণ রেখে যাচ্ছে। শীতের প্রতিটি ঝড়, প্রতিটি উল্টে যাওয়া নৌকা ও প্রতিটি অজানা কবর নতুন করে প্রশ্ন তুলছে–নিরাপদ ও বৈধ পথের দ্বার বন্ধ রেখে কতদিন এমন মৃত্যুমিছিল চলতে থাকবে।













