টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেললে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা
ছবিটি এ আই দিয়ে করা।
আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বাংলাদেশ ক্রিকেট সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), জাতীয় দলের ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ ও পুরো ক্রিকেট ব্যবস্থার ওপর এই ক্ষতির প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশ্বকাপ খেললেই যে আয় নিশ্চিত ছিল, টুর্নামেন্টে না নামলে সেই অর্থ পুরোপুরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ।
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অংশগ্রহণ ফি পায়। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ খেললে আইসিসি থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার পাওয়ার কথা ছিল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চার থেকে ছয় কোটি টাকার সমান। এই অর্থ না পেলে বিসিবির রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। বিসিবির বেতন কাঠামো অনুযায়ী, একটি আন্তর্জাতিক টি–টোয়েন্টি ম্যাচ খেললেই একজন ক্রিকেটার ন্যূনতম আড়াই লাখ টাকা ম্যাচ ফি পান। বিশ্বকাপে অন্তত পাঁচটি ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা ধরলে শুধু ম্যাচ ফি থেকেই খেলোয়াড়দের সম্মিলিত আয় হতো প্রায় দুই কোটি টাকা। এর সঙ্গে পারফরম্যান্স বোনাস ও প্রাইজমানির অংশ যুক্ত হলে খেলোয়াড়দের মোট ক্ষতির পরিমাণ চার থেকে পাঁচ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
এ ছাড়া কোচিং স্টাফ ও টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের জন্যও বিশ্বকাপ ছিল বাড়তি আয়ের সুযোগ। টুর্নামেন্টভিত্তিক ভাতা ও বোনাস মিলিয়ে এই খাতে আনুমানিক পঞ্চাশ লাখ থেকে এক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হতে পারে বলে বিসিবির অভ্যন্তরীণ হিসাব বলছে।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বকাপের সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক দিকেও। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশের ম্যাচ সাধারণত ভালো টেলিভিশন দর্শক টানে। এসব ম্যাচ না হলে টিআরপি কমার পাশাপাশি বিজ্ঞাপনদাতা ও স্পন্সরদের আগ্রহও হ্রাস পেতে পারে। সম্প্রচার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর ফলে পরোক্ষভাবে আরও দুই থেকে তিন কোটি টাকার সমপরিমাণ বাণিজ্যিক ক্ষতি হতে পারে।
এই আর্থিক ঝুঁকির মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় বিশ্বকাপে না খেলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের ক্রিকেটে প্রথমেই বড় আর্থিক আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আইসিসির এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে খেললেই বিসিবি, খেলোয়াড় ও ম্যানেজমেন্ট মিলিয়ে কোটি কোটি টাকার আয় নিশ্চিত হতো।
বাংলাদেশের আপত্তির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নিরাপত্তা উদ্বেগ। সাম্প্রতিক সময়ে পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে এই শঙ্কা আরও জোরালো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেখানে একজন ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে পুরো দল, সাংবাদিক ও দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়। এ কারণেই ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, দেশের মানুষের ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও আইসিসির ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, তারা ভারতের বাইরে নিরপেক্ষ ভেন্যুতেই খেলতে চান।
অন্যদিকে আইসিসি তাদের অবস্থানে অনড়। সংস্থাটি জানিয়েছে, টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে ভেন্যু পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়। নিরাপত্তা ঝুঁকির সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া ম্যাচ স্থানান্তর করলে ভবিষ্যতের টুর্নামেন্টগুলোর জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।
এর ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন জটিল সমীকরণ। একদিকে বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে নিরাপত্তা শঙ্কা উপেক্ষা করে ভারতে খেলতে যাওয়ার প্রশ্ন। এই দুই বাস্তবতার মাঝেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র:
আইসিসির প্রাইজমানি ও অংশগ্রহণ ফি সংক্রান্ত নীতিমালা, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আর্থিক কাঠামো, বিসিবি কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন।













