বার্সেলোনায় মাদকবিরোধী চিরুনি অভিযান: ৭২ গ্রেপ্তার, ১৩ নারকোপিসো সিলগালা
▪️ নাগরিকদের অভিযোগের সূত্র থেকে ১০ মাস ধরে তদন্ত করে পুলিশ।▪️ অভিযানে প্রায় ২০০ জন পুলিশ সদস্য অংশ নেন।
বার্সেলোনার কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় মাদকবিরোধী এক বৃহৎ অভিযান চালিয়েছে কাতালোনিয়ার আঞ্চলিক পুলিশ মোসোস দ’এস্কুয়াদ্রা, গার্দিয়া উরবানা, এবং শহর পুলিশের সদস্যরা। সোমবারের এই যৌথ অভিযানে মোট ১৩টি নারকোপিসো (মাদক বিক্রি ও সেবনের ফ্ল্যাট) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ফ্ল্যাট সিউতাত ভেল্লা (Ciutat Vella) অঞ্চলে এবং বাকি তিনটি সানৎস-মন্তজুইক (Sants-Montjuïc) ও আইশ্যামপ্লা (Eixample) এলাকায় অবস্থিত ছিল।
অভিযানে প্রায় ২০০ জন পুলিশ সদস্য অংশ নেন। এ সময় তারা কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেন এবং বেশ কিছু মাদকদ্রব্য ও নগদ অর্থ উদ্ধার করেন। পুলিশের হিসাবে, অভিযানটি এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতের নির্দেশে কিছু তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।
মাদক, টাকা ও নজরদারি ক্যামেরা উদ্ধার:
পুলিশ জানায়, আটক নারকোপিসোগুলো থেকে হেরোইন, ক্র্যাক, মারিজুয়ানা ও হাশিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া গেছে। কিছু ফ্ল্যাটে অনেক টাকাও উদ্ধার করা হয়।

অভিযানে আরও দেখা যায়, কিছু মাদক বিক্রির ফ্ল্যাটে বাইরের রাস্তা পর্যন্ত দেখা যায় এমন সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো ছিল, যাতে ভেতরের লোকজন দেখতে পারে কে দরজায় আসছে। পুলিশের মতে, এটি ছিল গ্রাহকদের চেনার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল।
দুপুরে অভিযান, কারণ তখনই সবচেয়ে বেশি ক্রেতা আসে:
তদন্তে জড়িত সূত্র জানায়, অভিযানটি সকালবেলায় নয়, বরং দুপুরে চালানো হয়। কারণ, এই সময়টাতেই ক্রেতারা বেশি আসে এবং মাদক বিক্রির কার্যক্রম সবচেয়ে সক্রিয় থাকে।
অভিযান পরিচালনা করে মোসোস দ’এস্কুয়াদ্রার পাবলিক হেলথ ইউনিট, যারা গার্দিয়া উরবানার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে। এছাড়া ড্রোন ইউনিট, কুকুর ইউনিট, মোটরসাইকেল টিম, নিরাপত্তা বাহিনী (ARRO)– সবাই অংশ নেয়।
নাগরিকদের অভিযোগের সূত্র থেকে ১০ মাস ধরে তদন্ত:
এই তদন্তের সূচনা হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ জানতে পারে যে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মাদক বিক্রি হচ্ছে।
ইন্সপেক্টর প্যাট্রিসিয়া দুরান, যিনি সিউতাত ভেল্লা থানার উপপ্রধান, বলেন—
“আমাদের নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ খুবই ঘনিষ্ঠ ও অবিচ্ছিন্ন। তাদের সহযোগিতার কারণেই আমরা এই অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি। বন্ধ করা নারকোপিসোগুলো ছিল অত্যন্ত সক্রিয়।”
মাদক ব্যবসার সঙ্গে নাগরিক জীবনের সম্পর্ক:
কার্লোস আলকারাজ, সিউতাত ভেল্লা থানার গার্দিয়া উরবানার প্রধান, বলেন—
“একটি মাদক বিক্রির জায়গা শুধু একটি ভবনের বাসিন্দাদের জন্যই নয়, বরং আশপাশের দোকানপাট ও সাধারণ মানুষের জন্যও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাদকসেবীরা প্রায়ই নিজেদের ডোজ কেনার জন্য চুরি বা ছিনতাই করে। তাই একবার কোনো নারকোপিসো শনাক্ত হলে যত দ্রুত সম্ভব তা বন্ধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
সিটি কাউন্সিলের প্রশংসা ও সতর্ক বার্তা:
বার্সেলোনা সিটি কাউন্সিলের নিরাপত্তা বিষয়ক উপ-মেয়র ও সিউতাত ভেল্লার কাউন্সিলর আলবার্ত বাতিয়ে, অভিযানের প্রশংসা করে বলেন—
“মাদকবিরোধী এই লড়াই পুলিশ, আদালত ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। এটি নাগরিকদের জন্য একটি বার্তা— যে বার্সেলোনায় অপরাধীরা কোনোভাবেই অদণ্ডিত থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন,
“মাদক ব্যবসা এমন এক সাতমাথা বিশিষ্ট দানবের মতো, যার একটি মাথা কাটা গেলেই আরেকটি গজায়। তবে এই লড়াই থেমে থাকবে না, কারণ মাদকই অনেক অপরাধের মূল উৎস।”
এ বছর ৭২ জন গ্রেপ্তার, ৫১টি নারকোপিসো বন্ধ:
সম্প্রতি সিউতাত ভেল্লা অঞ্চলের স্থানীয় নিরাপত্তা বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এবং ৫১টি নারকোপিসো বন্ধ করা হয়েছে।
এছাড়া আরও ৭টি ক্যানাবিস ক্লাব, যেগুলো আড়ালে মাদক বিক্রি করত, সেগুলোতেও অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নাগরিক সহযোগিতার কারণেই সাফল্য:
পুলিশ জানায়, নারকোপিসো বা মাদক বিক্রির ফ্ল্যাটগুলো শুধু মাদক ব্যবসাই নয়, বরং চুরি, ছিনতাই, প্রতিবেশীদের হয়রানি, ও দোকানপাটে ক্ষতি— এসব সমস্যাও সৃষ্টি করে। তাই এই সমস্যা মোকাবিলায় নাগরিকদের সহযোগিতা অপরিহার্য।
সিউতাত ভেল্লার নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকে বিশেষভাবে বলা হয় যে, নাগরিকদের অভিযোগ, সতর্কতা ও তথ্য প্রদান পুলিশের কাজকে সহজ করে তুলেছে।
বার্সেলোনার কেন্দ্রাঞ্চলে এই মাদকবিরোধী অভিযান শুধু অপরাধ দমনে নয়, বরং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
পুলিশ, সিটি কাউন্সিল ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত এই উদ্যোগ শহরবাসীর কাছে এক নতুন আস্থার বার্তা দিয়েছে যে,
বার্সেলোনাকে মাদকমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।













