শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

ভোট বিদেশে, দায় দেশে, প্রবাসীদের ভোট ও গণতন্ত্রের পরীক্ষা

রহমান মৃধা, প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫, ৩:০৮ এম
ভোট বিদেশে, দায় দেশে, প্রবাসীদের ভোট ও গণতন্ত্রের পরীক্ষা

প্রবাসীরা কখনোই কেবল অর্থ পাঠানোর বা ভ্রমণের কারণে দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকেনা। তাদের মধ্যে অসীম আবেগ,রাজনৈতিক উদ্বেগ এবং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশা থাকে। এই প্রত্যাশার ফলে যখন নির্বাচন কমিশন (EC) ঘোষণা করেছে যে,বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরাও দেশের জাতীয় নির্বাচনে ডাক-ভোটের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করতে পারবে (Postal Vote BD) অ্যাপ-প্রকল্পের মাধ্যমে তখন এটি কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়,বরং একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা বলে,অনেক দেশে প্রবাসী নাগরিকরা দূতাবাসে গিয়ে আগেভাগে (advance/early) ভোট দেন বা ডাক-ভোটের ব্যবস্থা ব্যবহার করেন তাতে ভোটারদের আইনগত অধিকার রক্ষা পায় কিন্তু অংশগ্রহণের হার সাধারণত স্থায়ী বসবাসকারী ভোটারদের তুলনায় কম থাকে। সুইডেনের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে নাগরিকরা বিদেশে থাকলেও কনস্যুলেটে আগেভাগে ভোট দিতে পারেন অথবা স্পেশাল পোস্টাল-মেটেরিয়াল অর্ডার করে পোস্টাল ভোট ব্যবহার করেন কিন্তু নির্বাচনের দিন সরাসরি অন্য দেশে বসেই ভোট দেয়া সম্ভব নয়। আগেভাগে ভোটই গৃহীত হয়। বাংলাদেশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এই নতুন অধ্যায়টি ঘোষণা করেছে এবং (Postal Vote BD) নামে একটি অ্যাপ বানিয়ে প্রবাসীদের নিবন্ধন ও ভোট প্রদান সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অ্যাপটি তৃতীয় সপ্তাহ নভেম্বর-এ চালুর কথা বলা হয়েছে এবং (EC) ইতিমধ্যে প্রবাসী ভোটারের নিবন্ধন ও ভোটিং প্রক্রিয়ার রূপরেখা প্রকাশ করেছে। তবে বাস্তবায়ন-তন্ত্র, নিরাপত্তা প্রটোকল ও পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত এখনও প্রকাশিত হওয়া বাকি।

খরচের কথা এড়িয়ে চলা সম্ভব (EC) জানিয়েছে, প্রতি পোস্টাল ব্যালট আনুমানিক ৭ হাজার টাকা খরচ হবে এবং সরকার/কমিশন ভোটারকে এ খরচ থেকে বিরত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লক্ষ্য হিসেবে ৫০ লাখ  প্রবাসী ভোটারকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হচ্ছে, ফলে মোট বাজেট বড় অঙ্কে বেড়ে যেতে পারে। এসব সংখ্যা ও খরচ দেশের জন্য একটা বাস্তব আর্থিক দায় তুলে ধরে।
প্রশ্ন জাগে, একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে এই খরচের বিকল্প ব্যবহার (শিক্ষা,স্বাস্থ্য, গণপরিবহন) কি আরও প্রাথমিক ও জরুরি নয় কি? নিবন্ধন ও যোগ্যতার শর্তগুলোও সমস্যা ছুঁতে পারে(EC) স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যাদের এনআইডি(NID) লক’ বা ‘সাসপেন্ড’ রয়েছে, তারা বিদেশ থেকে নিবন্ধন করে ভোট দিতে পারবেন না। এটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে তা ইতোমধ্যেই বিতর্কের কারণ হয়েছে (কয়েকটি সূত্রে পরিবারের সদস্যদের এনআইডি লক (NID-lock) নিয়ে প্রতিবেদন দেখা গেছে)। প্রয়োজনে যে (NID-লক) বা ভেরিফিকেশন-সম্পর্কিত জটিলতা দ্রুত সমাধান না করা হয়, অনেক প্রবাসী ভোটারের অংশগ্রহণ তখনই বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র প্রযুক্তি নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘কাদের জন্য ও ‘কাদের পক্ষে’ ভোট দেয়া হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মনোনয়ন-বাণিজ্য, নির্বাচনী তহবিলের অসম সুযোগ এবং ক্ষমতা-অর্থের ঘনিষ্ট সংযোগ ব্যাপকভাবে তথ্যভিত্তিক গবেষণায় ও প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে: Transparency International Bangladesh এর বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন এমপিদের সম্পদের অতি-বৃদ্ধি এবং নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দেখিয়েছে; এছাড়া অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রার্থীরা মনোনয়ন অর্জনের জন্য অনেকখানি টাকা ব্যয় করেন। এই বাস্তবতা প্রবাসীদের সামনে এক কঠিন নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে তাদের সময় ও দেশের অর্থ ব্যয় করে কি এরকম ‘অযোগ্য’ বা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয়া যুক্তিসংগত হবে?

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ডাক-ভোট পদ্ধতিতে প্রযুক্তি ও লজিস্টিকের ঝুঁকি থাকবেই: ব্যালটের চেইন-অফ-কাস্টডি কিভাবে বজায় রাখা হবে, কোন কুরিয়ারের মাধ্যমে নিরাপদ প্রেরণ নিশ্চিত করা হবে, আন্তর্জাতিক ডাকবিভাগে বিলম্ব হলে ভোটপত্র হারানো বা দেরিতে পৌঁছানো কি রকম প্রভাব ফেলবে, এসব প্রশ্ন প্রকাশ্যে আছে। সঙ্গে আছে অ্যাপ-ভিত্তিক নিবন্ধন ও ভেরিফিকেশনের সাইবার-ভূমি,ডেটা সুরক্ষা,আইডি-চুরি বা ম্যালওয়্যার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে (EC) কেমন নিরাপত্তা গ্রহণ করবে, সেটা জানা প্রয়োজন। আরেকটি ঝুঁকি হলো ‘ভোট বিক্রি’ বা টিকিট-বাণিজ্য: প্রবাসীর ভোটকে যখন আর্থিকভাবে প্রবেশযোগ্য করে তোলা হবে, তখন অনৈতিক অর্থের প্রভাব বজায় থাকা খুব সহজ। এইসব ঝুঁকি সম্পর্কে সংবাদ ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণগুলো সতর্ক করেছে।

অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্নও গুরত্বপূর্ণ: যদি একটি গরিব দেশের সরকার লক্ষ কোটি টাকার খরচ করে প্রবাসী ভোট চালু করে এবং ফলাফল হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তিত না হয় অর্থাৎ যদি মনোনয়ন-বাণিজ্য বেড়ে যায়, দুর্নীতির তদন্ত ও জবাবদিহি না অক্ষত থাকে—তাহলে এই ব্যয় কি নৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক? এখানে দুটি দিক বিবেচ্য: (ক) নাগরিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব,প্রবাসীরাও নাগরিক; তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার অংশ (খ) সুযোগ-খরচ তথ্য-স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা ছাড়া এই ব্যয় দেশের যেখানে বেশি দরকার সেখানে অন্যান্য সামাজিক খাতে ব্যবহৃত হলে বেশি ফলপ্রসূ হত। ফলে প্রয়োজন একটি পরিমিত,স্বচ্ছ ও পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন কৌশল।
এই বাস্তবতায় আমাকে যে সুপারিশগুলো সবচেয়ে লাজিমি মনে হয় সেগুলো হলো প্রধানত (১) প্রার্থী-স্বচ্ছতা ও ভেটিং মেকানিজম বাধ্যতামূলক করা, যাতে প্রত্যেক প্রার্থীর সম্পদ, মামলা, ট্যাক্স ও সরকারি দায়-দায়িত্বের ইতিহাস অনলাইন পোর্টালে খোলা থাকে (২) দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা, টাকার ভিত্তিতে মনোনয়নকে বন্ধ করা (৩) (Postal Vote BD) চালুর আগে ছোট পাইলট পরিচালনা করা—নির্দিষ্ট কয়েকটি মিশন/দেশে পরীক্ষা করে সমস্যা উঠে এলে তা ঠিক করা (৪) ব্যালট প্রেরণ ও গ্রহণ পর্যায়ে ব্লক-লেভেল চেইন-অফ-কাস্টডি ও ট্র্যাকিং নম্বর প্রয়োগ করা; (৫) স্বাধীন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়া (৬) প্রবাসীদের তথ্য-সচেতনতা বাড়াতে দূতাবাস, কমিউনিটি সংগঠন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা। এগুলো না করলে প্রবাসী ভোট কেবল খরচসাপেক্ষ পরিবর্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করবে।

প্রবাসীরা, বিশেষ করে সুইডেনে থাকা বাংলাদেশিরা, যা করতে পারেন তা হলো নিজ NID/ভোটার স্ট্যাটাস এবং পাসপোর্টের কাগজ রাখুন  দূতাবাস/কনস্যুলেটের ঘোষণাগুলো অতধিক সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করুন, স্থানীয় কমিউনিটি গ্রুপের মাধ্যমে প্রার্থীর ইতিহাস যাচাই ও আলোচনা চালান এবং ভোট দেয়ার আগে প্রার্থীর নীতিবোধ ও অধিকার/দায়িত্বের রেকর্ড দেখে বিবেচনা করুন। সুইডেনের প্রথা যেখানে আগেভাগে (advance) ভোট ও কনস্যুলেট-ভোট প্রচলিত, সেখানে বাংলাদেশি প্রক্রিয়াও যদি কুশলভাবে ডিজাইন করা হয়, তবে অংশগ্রহণ সম্ভব কিন্তু শেষ কথা সবসময়ই বিশ্বাস ও স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করবে।

পরিশেষে, আমি মনে করি প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি যেন কেবল আনুষ্ঠানিক অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। ভোট দেওয়ার সুযোগ ও সময়, দেশের অর্থ এবং প্রবাসীদের আবেগীয় বিনিয়োগ সব মিলিয়ে যদি ফলপ্রসূ প্রতিনিধিত্ব না আসে, তাহলে সেই সুযোগ শেষপর্যন্ত জনগণের কল্যাণে কাজে লাগবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই, তবে এখনো নিবন্ধন করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যোগ্য ও নীতিবান ব্যক্তি যদি মনোনয়ন না পান, তবে দুর্নীতিবাজ বা অযোগ্য প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ভোট শুধু একটি অধিকারের প্রয়োগ নয়,এটি বিবেকেরও প্রকাশ। তাই আমি চাই, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার মানদণ্ড স্পষ্ট করুক, যাতে প্রবাসী নাগরিকরা আস্থার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারেন। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ প্রবাসীদের সচেতন, বিবেকনির্ভর অংশগ্রহণের ওপরও নির্ভরশীল। তাই প্রবাসীদের ভোট কেবল এক দায়িত্ব নয়। এটি তাদের নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলনও হতে হবে।

গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা রক্ষায় সেনা পাঠাচ্ছে ফ্রান্স

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৭ পিএম
সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা রক্ষায় সেনা পাঠাচ্ছে ফ্রান্স

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি মিলিশিয়ার হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। তবে এই সামরিক মোতায়েন কোনো সংঘাতে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সৌদির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্যারিস।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই দিন দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুর জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় ফ্রান্স সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে বলে জানান তিনি।

সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স ২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাক্রোঁ বলেন, কোনো সংঘাতে জড়ানোর জন্য নয়, বরং জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পাঠানো হবে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সৌদি আরবকে আরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ম্যাক্রোঁ জানান, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের বাজারে গ্যাসের দাম কমাতে ফ্রান্স বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সৌদি আরবে সামরিক সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্তও সেই উদ্যোগের অংশ।

চলমান সংঘাতের প্রভাবে তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের মিত্র হুথি মিলিশিয়া সৌদি আরবে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার কারণে লোহিত সাগরসংলগ্ন বন্দরগুলো থেকে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আবারও সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেওয়ার প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা সুরক্ষায় সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিল ফ্রান্স।

এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি, কাটছে গ্যাস সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:০৯ পিএম
এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তি, কাটছে গ্যাস সংকট

বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে কার্গো জাহাজ থেকে ভাসমান টার্মিনালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি খালাস আবার শুরু হয়েছে। এতে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে শিগগিরই দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মহেশখালীতে এলএনজি খালাসের কাজ পুনরায় চালু হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরবরাহে এর প্রভাব দেখা যায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টা নাগাদ এলএনজি থেকে প্রায় ৭৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। একই সময়ে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যায় প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। সব মিলিয়ে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ২৩৪ কোটি ঘনফুট।

এর আগে বঙ্গোপসাগরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে এলএনজি সরবরাহে হঠাৎ বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ইন্দোনেশিয়া থেকে এলএনজি নিয়ে আসা ‘প্যাসিফিক সাকসেস’ নামের একটি কার্গো জাহাজ বৃহস্পতিবার মহেশখালীতে পৌঁছালেও উত্তাল সাগরের কারণে সেটি থেকে সামিটের ভাসমান টার্মিনালে গ্যাস স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ফলে একটি টার্মিনাল থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছিল। একপর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুটে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

চাহিদার তুলনায় এখনো ঘাটতি

পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার সেই সরবরাহ কমে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়।

দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আমদানিকৃত এলএনজি থেকে আসে। মহেশখালীর সমুদ্র এলাকায় থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় পাইপলাইনে পাঠানো হয়। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি সামিট গ্রুপের।

দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক সর্বোচ্চ সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে কার্গো থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থায় দ্রুত প্রভাব পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি টার্মিনালে মজুত এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কার্গো মহেশখালীতে পৌঁছে গেলেও সাগরের পরিস্থিতির কারণে সেটি থেকে এলএনজি খালাস করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে যে পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যাওয়ার কথা, তার তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

শুক্রবার সকালে আবহাওয়ার উন্নতি হলে আবার কার্গো থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বাড়তে থাকে।

এর আগে জুলাইয়ে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পরও দেশে বড় ধরনের গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছিল। প্রায় এক মাস পর আগস্টে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হয়। এরপর এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও কিছুটা উন্নত হচ্ছিল।

এর মধ্যেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন করে এলএনজি খালাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহে আবার চাপ তৈরি হয়। শুক্রবার সকালে খালাস পুনরায় শুরু হওয়ায় সেই পরিস্থিতি আপাতত কাটতে শুরু করেছে। তবে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো কম থাকায় গ্যাসের ঘাটতি পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে আমদানি ও এলএনজি খালাস নিয়মিতভাবে চালু থাকার ওপর।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চড়া হয়েছে সবজির দাম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৫৫ পিএম
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চড়া হয়েছে সবজির দাম

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানীর খুচরা বাজারে বেশ কিছু সবজির দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেগুন, করলা, পটল, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙা ও ধুন্দলসহ বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামরিচ ও টমেটোর দামও ঊর্ধ্বমুখী।

শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারভেদে লম্বা বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং কোথাও কোথাও ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও একই ধরনের বেগুন ৯০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিল।

করলা এখন মানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে উঠেছে। ঝিঙা ও ধুন্দলের ক্ষেত্রেও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে। কাঁচা পেপের দাম অবশ্য আগের মতোই প্রায় ৩০ টাকা কেজি রয়েছে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

বাজারে সবজির পাশাপাশি মাছের দামেও কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। আকারভেদে রুই মাছ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পাঙ্গাস ২২০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে সব পণ্যের দাম বাড়েনি। ফার্মের ডিম, ব্রয়লার ও অন্যান্য মুরগির দাম মোটামুটি আগের অবস্থাতেই রয়েছে। বাজারভেদে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি প্রায় ৩২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দাম সামান্য বাড়লেও বাজারে তা ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা ডজনের মধ্যে রয়েছে। চালের দামেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় কোনো প্রভাব এখনো দেখা যায়নি।

পরিবহন খরচের প্রভাব, নাকি বাড়তি মুনাফা?

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। যশোর থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সবজি পরিবহনের উদাহরণ দিয়ে এক ব্যবসায়ী জানান, আগে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকের ভাড়া প্রায় ১৮ হাজার টাকা থাকলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর তা বেড়ে ২১ হাজার টাকার কাছাকাছি হয়েছে। এতে বেগুনসহ অন্যান্য সবজির পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দর কার্যকর হয় ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। এর আগে চলতি বছর এপ্রিল ও জুনেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর পাইকারি বাজার পর্যন্ত পণ্য আনতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। সেই ব্যয়ের একটি অংশ খুচরা মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহন ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় অনেক পণ্যের দাম খুচরা বাজারে বেশি হারে বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব থাকলেও একবারে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর যৌক্তিকতা সব ক্ষেত্রে নেই। বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।

এদিকে দুধ, আটা ও ময়দার দামেও সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাও একই পরিমাণ দাম বাড়িয়েছিল। পাশাপাশি দুই সপ্তাহ আগে সরবরাহকারী কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আটা ও ময়দার দামও বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। প্রতি লিটারে প্রায় চার টাকা বাড়ার পর দুই লিটারের একটি বোতল এখন ৪০৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দরের প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ব্যবসায়ীরা পরিবহন ব্যয়কে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বললেও ক্রেতারা বলছেন, বাজারে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগে খুচরা পর্যায়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

প্রবাহ বাংলা নেটওয়ার্ক