২৫ হাজার বছর আগেও সুপারি চুষে নেশা করত মানুষ, প্রাচীন দাঁতে মিলল প্রমাণ
মাদক বা নেশাজাতীয় উপাদানের ব্যবহার আধুনিক সমাজের কোনো নতুন প্রবণতা নয়। বরং মানুষের ইতিহাসের অনেক গভীরেই এর শিকড় রয়েছে। নতুন এক গবেষণায় এমনই চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। গবেষকদের দাবি, প্রায় ২৫ হাজার বছর আগেও মানুষ নেশার উদ্দেশ্যে সুপারি ব্যবহার করত।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েশি অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রাচীন মানুষের কঙ্কালের দাঁত পরীক্ষা করে এই সম্ভাবনার সন্ধান পেয়েছেন। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ সেন্টার ফর হিউম্যান এভলিউশনের অধ্যাপক কার্নি ম্যাথেসন ও গবেষক মিশেল ল্যাংলি। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সাইন্স এডভান্সেস (Science Advances)-এ।
গবেষকদের হাতে থাকা দুটি কঙ্কালের একটি আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছরের পুরনো। অন্যটির বয়স প্রায় ৭৬০০ থেকে ৬৩০০ বছর। উভয় কঙ্কালের দাঁতেই বিশেষ ধরনের ক্ষয়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। দাঁতের ওপর তৈরি হয়েছিল গভীর ও প্রায় গোলাকার খাঁজ, যা সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষয়ের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
গবেষকদের ধারণা, দীর্ঘ সময় ধরে মুখের মধ্যে গোটা সুপারি রেখে চোষার ফলে দাঁতে এমন দাগ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ক্ষয়ের নিদর্শন প্রাচীন মানবদেহের নমুনায় আগে খুব একটা দেখা যায়নি। ফলে এটি মানুষের প্রাচীন আচরণ ও নেশার ইতিহাস সম্পর্কে নতুন একটি সূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণাগারেও মিলল সুপারির রাসায়নিক প্রমাণ
শুধু দাঁতের ক্ষয়ের ওপর নির্ভর করেননি গবেষকেরা। সুপারি চোষার ফলে শরীরে কী ধরনের রাসায়নিক প্রভাব তৈরি হতে পারে, সেটিও পরীক্ষা করা হয়। সুপারি কৃত্রিম লালার মধ্যে রেখে গবেষণাগারে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, গোটা সুপারি চোষার সময় আরেকলিন (arecoline) নামের একটি নিউরোঅ্যাক্টিভ অ্যালকালয়েড নিঃসৃত হতে পারে। এই রাসায়নিক মানবদেহে উদ্দীপক প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন দাঁতের টিস্যু বিশ্লেষণে। গবেষকেরা সেখানে আরেকলিনের উপস্থিতির ইঙ্গিত পেয়েছেন। এর ফলে ওই মানুষদের সুপারি ব্যবহারের ধারণাটি আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারি চোষার অভ্যাস শুধু নেশার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। দাঁতের ব্যথা বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার উপশমের জন্যও প্রাচীন মানুষ সুপারি ব্যবহার করে থাকতে পারেন। তবে দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসের নেতিবাচক প্রভাবও ছিল। অতিরিক্ত ব্যবহারে দাঁতের ক্ষয় ও অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনকি খাদ্য গ্রহণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা গিয়েছিল, প্রায় ১৩ হাজার বছর আগে মানুষের মধ্যে গাঁজন করা পানীয় ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কিন্তু নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মানুষের নেশাজাতীয় উপাদান ব্যবহারের ইতিহাস তারও বহু আগে শুরু হয়ে থাকতে পারে।
গবেষকদের এই আবিষ্কার তাই শুধু সুপারি ব্যবহারের ইতিহাস নয়, বরং প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং নেশাজাতীয় উপাদানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য দিচ্ছে।













