ছাত্ররাজনীতি,শিক্ষার পরিবেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ: পথ হারালে ক্ষতি কার, ফিরলে লাভ কার
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। শিক্ষার্থীরা শুধু আগামী দিনের কর্মজীবী মানুষ নন; তারাই ভবিষ্যতের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাই শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ, ছাত্ররাজনীতির চরিত্র এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে জাতি তার তরুণদের সঠিক পথে চালিত করতে পারে, সে জাতি অন্ধকারেও আলোর দিশা পায়; আর যে জাতি তাদের অবহেলা করে, সে নিজের ভবিষ্যতের বীজ নিজেই নষ্ট করে ফেলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বহু গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন জাতীয় সংকটে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। অনেক সময় ছাত্রনেতারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের বৃহত্তর কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন। এ কারণেই দেশের মানুষ ছাত্রসমাজের প্রতি বিশেষ আস্থা ও প্রত্যাশা পোষণ করে। ছাত্ররা যখন জেগে ওঠে, তখন সমাজের বিবেকও জাগ্রত হয়। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সময়ের দাবি, তাদের পদক্ষেপে ধ্বনিত হয় ইতিবাচক পরিবর্তনের আহ্বান।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গন নিয়ে নানা উদ্বেগ, অভিযোগ এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং জনপরিসরে এমন অভিযোগ প্রায়ই আসে যে, কিছু ব্যক্তি ছাত্র পরিচয় ব্যবহার করে সহিংসতা, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মব সংস্কৃতি কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষ থেকে আবার এসব অভিযোগের সত্যতা, ব্যাপ্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। ফলে বাস্তবতা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং স্বাধীন অনুসন্ধানের ওপরই বর্তায়। অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়; কিন্তু অভিযোগ যখন বারবার উচ্চারিত হয়, তখন রাষ্ট্রের উচিত তা হালকাভাবে না নেওয়া।
যে অভিযোগই থাকুক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো সহিংসতার কেন্দ্র হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা, গবেষণা, বিতর্ক, মানবিকতা ও জ্ঞানচর্চার নিরাপদ ক্ষেত্র। সেখানে যদি ভয়, দখলদারিত্ব বা রাজনৈতিক আধিপত্য শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করে, তবে পুরো জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষাঙ্গন হলো জাতির মস্তিষ্ক; সেখানে যদি বিষ প্রবেশ করে, তবে চিন্তার শিরা-উপশিরায় তার নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
ছাত্রদের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত ‘শিক্ষার্থী’। রাজনীতি সম্পর্কে জানার, মত প্রকাশের কিংবা গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অধিকার তাদের অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ কখনোই সহিংসতা, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার পর্যায়ে যেতে পারে না। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রেরও উচিত নয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার স্থায়ী ময়দানে পরিণত করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি দলীয় প্রভাবের ভারে নুয়ে পড়ে, তবে সেখানে জ্ঞানের বদলে ভয়ের সংস্কৃতি জন্ম নেয়; আর ভয়ের মাটিতে কখনো মেধার ফুল ফোটে না।
শিক্ষার মান নিয়েও আজ অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে কঠোর অধ্যয়ন, নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও মেধার মূল্যায়নের পরিবর্তে অন্য কোনো অন্যায্য প্রভাব কাজ করে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হবে ভয়াবহ। একটি দেশ তখন দক্ষ মানবসম্পদ হারাবে, কর্মসংস্থানের বাজারে দেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। জ্ঞানচর্চা যখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার খোলসে বন্দি হয়ে যায়, তখন ডিগ্রি বাড়ে কিন্তু দক্ষতা বাড়ে না; সনদ বাড়ে কিন্তু সক্ষমতা বাড়ে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণদের একটি অংশ যদি অপরাধচক্র, মাদক, সহিংসতা বা দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ে। একজন তরুণ যখন শিক্ষা ও দক্ষতার পরিবর্তে অবৈধ পথকে সফলতার ‘শর্টকাট’ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সমাজে নৈতিক অবক্ষয় মহামারি আকার ধারণ করে। এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। একটি সমাজের নৈতিক শিকড় যখন দুর্বল হয়, তখন তার ডালপালা যতই বিস্তৃত হোক না কেন, ঝড়ে তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, অভিভাবক, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার সংকট কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংকট নয়; এটি জাতির আত্মার সংকট। আর আত্মার চিকিৎসা একক হাতে হয় না, সেখানে প্রয়োজন সম্মিলিত যত্ন, ধৈর্য এবং নৈতিক সাহস।
সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। যে-ই অপরাধ করুক না কেন, তার রাজনৈতিক পরিচয়, ছাত্র পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত ও বিচার হতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে মুক্তি পাওয়া বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকা মাত্রই যেমন কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না, তেমনি যাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আইনের শাসন যদি দৃশ্যমান না হয়, তবে মানুষ ন্যায়বিচারের বদলে গুজবের ওপর ভরসা করতে শুরু করে, আর সেটিই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
রাজনৈতিক দলগুলোরও আজ আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। ছাত্রসংগঠনকে যদি নেতৃত্ব তৈরির পাঠশালা হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে সেখান থেকে ভবিষ্যতের দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক তৈরি হবে। আর যদি ছাত্রসংগঠন ক্ষমতার প্রদর্শন, সহিংসতা কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের বাহন হয়ে ওঠে, তাহলে তার খেসারত পুরো জাতিকেই দিতে হবে। নেতৃত্ব মানে কেবল মিছিলের সামনে হাঁটা নয়; নেতৃত্ব মানে শৃঙ্খলা, সংযম, দায়িত্ববোধ এবং বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা।
শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষককে অপমান করা মানে একটি জাতির জ্ঞানচর্চার ভিত্তিকে দুর্বল করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, প্রশাসন ও একাডেমিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষক যদি নিরাপদ না থাকেন, তবে শ্রেণিকক্ষও নিরাপদ থাকে না। আর শ্রেণিকক্ষ নিরাপদ না হলে ভবিষ্যৎও নিরাপদ থাকে না।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে কম নয়। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে—সে বিষয়ে সচেতন নজরদারি থাকা জরুরি। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা ইতিবাচক পথে নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে। তরুণদের হাতে যদি বই, খেলার বল, বাদ্যযন্ত্র, গবেষণাগার আর সৃজনশীলতার সুযোগ তুলে দেওয়া যায়, তবে তাদের মন থেকে সহিংসতার আকর্ষণ অনেকটাই কমে যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণদের প্রতি আমাদের আস্থা হারানো যাবে না। কয়েকজনের অপরাধের দায় পুরো ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি অপরাধকে ছাত্ররাজনীতির নামে বৈধতা দেওয়াও সমান ক্ষতিকর। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশোনা করছে, পরিবার ও দেশের জন্য সুন্দর স্বপ্ন দেখছে। তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তরুণদের চোখে যদি স্বপ্ন থাকে, তবে জাতির চোখেও ভবিষ্যতের আলো জ্বলে; আর তাদের চোখে যদি ভয় জমে, তবে সমাজের আকাশও মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
যদি শিক্ষার পরিবেশ দ্রুত ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তির সংকট, বেকারত্ব বৃদ্ধি, সামাজিক অস্থিরতা, বিনিয়োগে অনীহা, মেধা পাচার এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার মতো গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে। পক্ষান্তরে, যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করা যায়, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা যায় এবং ছাত্ররাজনীতিকে ইতিবাচক নেতৃত্ব বিকাশের পথে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে বাংলাদেশ একটি দক্ষ, মানবিক ও উদ্ভাবনী জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা হবে না, হবে চরিত্র গঠনের আশ্রম; হবে মুক্ত বিতর্কের মঞ্চ, গবেষণার উর্বর ক্ষেত্র এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রকৃত কারিগরখানা।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো জাতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে টিকে থাকে না। টিকে থাকে শিক্ষা, নৈতিকতা, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর। তাই আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কেমন বাংলাদেশ পাবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা ও ছাত্রসমাজ গড়ে তোলা, যেখানে পরিচয়ের চেয়ে সততা, মেধা, শৃঙ্খলা এবং দেশপ্রেম বেশি গুরুত্ব পাবে। কারণ শিক্ষার্থীরা পথ হারালে একটি জাতি পিছিয়ে যায়, আর শিক্ষার্থীরা সঠিক পথে এগোলে পুরো দেশ এগিয়ে যায়। আর সেই এগিয়ে যাওয়া কেবল উন্নয়নের শুষ্ক হিসাব নয়, তা হবে আত্মমর্যাদা, ন্যায়বোধ ও আলোকিত ভবিষ্যতের দিকে এক দৃঢ় ও গৌরবময় যাত্রা।
লেখক ও গবেষক।ইমেইল: [email protected]










