ব্রেক্সিটের ১০ বছর
মত বদলাচ্ছে ব্রিটেন, ইইউতে ফিরে যাওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে
২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। সেই সিদ্ধান্তের এক দশক পূর্তিতে দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ জনমতের বড় একটি অংশ এখন আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন ব্রেক্সিট ছিল ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যতে আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫৫ থেকে ৫৮ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক সুযোগ পেলে ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেবেন। একই সঙ্গে ৫৭ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইইউতে ফিরে যাওয়ার সমর্থন সবচেয়ে বেশি। ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ নতুন গণভোটের পক্ষে এবং সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
অর্থনীতিতে ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব:
ব্রেক্সিটের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বাজার থেকে বেরিয়ে আসার ফলে বাণিজ্য ব্যয় বেড়েছে, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমেছে এবং উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে।
ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, মাথাপিছু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিচের দিকেই রয়েছে। একই সঙ্গে পাউন্ডের মূল্যহ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রেখেছে।
বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ধাক্কা:
ব্রেক্সিটের ফলে শুধু অর্থনীতিই নয়, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
ইউরোপজুড়ে গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অবাধ চলাচল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আগের তুলনায় জটিল হয়ে পড়েছে। বহু বিজ্ঞানী মনে করেন, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় গবেষণায় নেতৃত্বের অবস্থান হারিয়েছে।
সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। আগে সহজে ইউরোপজুড়ে কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক সফর করা গেলেও এখন ভিসা, কাস্টমস ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক শিল্পীর জন্য ইউরোপ সফর ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়েছে।
লন্ডন বনাম ব্রিটেনের অন্য অঞ্চল:
ব্রেক্সিট গণভোটের সময় লন্ডনের অধিকাংশ ভোটার ইইউতে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তবে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের হ্যাভারিংসহ কয়েকটি এলাকায় অধিকাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে ছিলেন।
বর্তমানে এসব এলাকার অনেক ভোটারও হতাশ। তাদের অভিযোগ, ব্রেক্সিটের মাধ্যমে যে উন্নয়ন, শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে ব্রেক্সিট-সমর্থকদের একটি অংশ এখনও বিশ্বাস করেন, সমস্যা ব্রেক্সিটে নয়; বরং সরকার সঠিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, দেশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হওয়া উচিত এবং অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
রাজনীতিতে বদলে যাচ্ছে আলোচনা:
২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্রেক্সিট বড় কোনো ইস্যু ছিল না। কিন্তু বর্তমানে বিরোধী ও বামঘেঁষা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দিচ্ছে। কেউ কেউ কাস্টমস ইউনিয়নে ফেরার কথাও বলছেন, যদিও পূর্ণ সদস্যপদ এখনই রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খুব শিগগির নতুন কোনো গণভোট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে জনমতের পরিবর্তন ভবিষ্যতে ব্রিটেনের ইউরোপ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
তরুণদের মধ্যে ইউরোপমুখী প্রবণতা:
ব্রেক্সিটের সময় যারা ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, সেই নতুন প্রজন্ম এখন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, ইরাসমাস শিক্ষাবৃত্তি এবং ইউরোপে অবাধ চলাচলের সুযোগ ফিরে পেতে আগ্রহী। এ কারণে তরুণ ভোটারদের বড় অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে কোনো এক সময় যুক্তরাজ্যের আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া উচিত।
সামনে কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার জন্য জনসমর্থন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হলেও, বাস্তবে পুনরায় সদস্যপদ পাওয়ার পথ সহজ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরতে হলে নতুন করে সদস্যপদের আবেদন, দীর্ঘ আলোচনা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এছাড়া আগের মতো বিশেষ সুবিধা বা ব্যতিক্রমী শর্ত পাওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম।
তবুও এক দশক পর ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটিশ জনমতের এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এখন দেশটির রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম













