জিব্রাল্টারের নিচে স্পেন-মরক্কোর স্বপ্নের টানেল: বাস্তবায়িত হলে আধা ঘণ্টায় ইউরোপ থেকে আফ্রিকা
প্রায় চার দশক ধরে জিব্রাল্টার প্রণালির নিচ দিয়ে একটি টানেল নির্মাণের স্বপ্ন দেখছে স্পেন ও মরক্কো। দীর্ঘদিন আলোচনা ও পরিকল্পনার পর এখন আবারও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোতে শুরু করেছে দুই দেশ। তবে প্রকল্পটির সামনে এখনও বড় প্রযুক্তিগত ও ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রেল টানেল স্পেনের তারিফা এলাকার পুন্তা পালোমা এবং মরক্কোর তাঞ্জিয়ারের কাছে অবস্থিত কাবো মালাবাতাকে যুক্ত করবে। টানেলটি নির্মিত হলে ইউরোপ থেকে আফ্রিকায় ট্রেনে যেতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ মিনিটের মতো।
প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৪২ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ২৭ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশ থাকবে সমুদ্রের নিচে। সবচেয়ে গভীর অংশটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৪৭৫ মিটার নিচ দিয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের অন্যতম বড় এবং জটিল প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।
টানেলটির নকশা অনুযায়ী দুটি পৃথক রেলপথ থাকবে, প্রতিটির অভ্যন্তরীণ ব্যাস হবে প্রায় ৮ মিটার। এছাড়া মাঝখানে থাকবে একটি সেবা ও জরুরি ব্যবহারের গ্যালারি, যার মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ ও দুর্ঘটনার সময় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হবে।
এই পথে উচ্চগতির যাত্রীবাহী ট্রেন চলবে। পাশাপাশি পণ্য ও যানবাহন পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেনও ব্যবহৃত হবে।
স্পেনের পক্ষ থেকে প্রকল্পটি পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেসেগসা। মরক্কোর সরকারও এই সংযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় দুই দেশের বিজ্ঞানীরা তিন বছর ধরে জিব্রাল্টার প্রণালির ভূমিকম্প ও ভূ-গঠনগত ঝুঁকি নিয়ে যৌথ গবেষণা করবেন।
এদিকে চলতি বছর স্পেন সরকার প্রকল্প-সংক্রান্ত গবেষণার জন্য অতিরিক্ত ১৭ লাখ ৩০ হাজার ইউরো বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রতলের গঠন, পলি, শিলা ও পরিবেশগত অবস্থা বিশ্লেষণের জন্য আরও একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে ‘উমব্রাল দে কামারিনাল’ নামের একটি অঞ্চলকে। এটি জিব্রাল্টার প্রণালির অপেক্ষাকৃত অগভীর অংশ হলেও ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত জটিল।
এই অঞ্চলের মাটির নিচে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বেলেপাথর ও কাদামাটির স্তর, যা টানেল খননের কাজকে কঠিন করে তুলতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগ হলো, জিব্রাল্টার প্রণালি এমন একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, যা আজোরেস-জিব্রাল্টার-তিউনিস ফল্ট লাইনের অংশ। ১৭৫৫ সালের ভয়াবহ লিসবন ভূমিকম্পও এই ভূ-গঠনগত ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
এ কারণে প্রকৌশলীরা প্রকল্পটিকে প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব বললেও এটিকে অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হিসেবে বিবেচনা করছেন।
শুধু ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিই নয়, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতি বছর এক লাখের বেশি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করে। এছাড়া এলাকাটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
এখানে প্রায় ১ হাজার ৯০০ প্রজাতির সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে ওরকা তিমি সংরক্ষণের জন্য কঠোর পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানতে হবে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু স্পেনের অংশ নির্মাণেই ৮৫০ কোটি ইউরোর বেশি খরচ হতে পারে। আর পুরো প্রকল্পের ব্যয় ১৫০০ কোটি ইউরোরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই অর্থ স্পেন, মরক্কো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ভাগাভাগি করে বহন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত সম্ভব নয়। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব গবেষণা ও পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে ২০২৭ সালে অনুসন্ধানী সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ শুরু হতে পারে।
সর্বোত্তম পরিস্থিতিতেও টানেলটি ২০৩৫ থেকে ২০৪০ সালের আগে চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাস্তবে এটি ২০৪০-এর দশকেই চালু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই টানেল নির্মিত হলে ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্য, পরিবহন এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা হবে। একই সঙ্গে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তবে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে রেলপথে যুক্ত করার এই স্বপ্ন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাস্তবতার কাছাকাছি হলেও প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করছে আগামী কয়েক বছরের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের ওপর।













