সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও জনসেবার পথচলা: শেখ আব্দুল লতিফের চার দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে অনেকেই নীরবে কাজ করে যান মানুষের কল্যাণে, সংগঠনকে শক্তিশালী করতে এবং সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে। তাঁদেরই একজন শেখ আব্দুল লতিফ। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে নিজ এলাকার একজন পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
শেখ আব্দুল লতিফের রাজনৈতিক ও নেতৃত্বের পথচলার সূচনা ঘটে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জগদল আল ফারুক উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। ১৯৭৮-৭৯ শিক্ষাবর্ষে বিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ভোটের মাধ্যমে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) নির্বাচিত হন। সেই সময় থেকেই নেতৃত্ব, সংগঠন পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তাঁর আগ্রহ ও সক্ষমতার পরিচয় প্রকাশ পেতে শুরু করে।
বিদ্যালয় জীবনের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে তিনি সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছেও প্রশংসিত হন।
উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। ১৯৮৬ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মদনমোহন কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় ছাত্র ইউনিয়নসহ চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল থেকে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) পদে নির্বাচন করেন। যদিও সেই নির্বাচনের ফলাফল তাঁর পক্ষে না এলেও ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় আরও সুদৃঢ় হয়।
ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি হয়, তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অঙ্গসংগঠন যুবদলে যোগদান করেন। দলীয় কর্মকাণ্ডে তাঁর নিষ্ঠা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলীর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে দিরাই উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি হাওরবেষ্টিত ভাটির জনপদ দিরাইয়ে যুবদলকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তৃণমূল পর্যায়ে কর্মী সংগ্রহ, সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর উদ্যোগ প্রশংসিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে উপজেলা যুবদল নতুন গতি লাভ করে এবং সংগঠনটি স্থানীয় পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ভিত্তি অর্জন করে।
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি জেলা যুবদলের কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জেলা বিএনপির সদস্যপদ লাভ করেন। দলীয় পদ-পদবি বা ক্ষমতার চেয়ে আদর্শ ও কর্মী হিসেবে কাজ করাকেই তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে বিএনপির একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও শেখ আব্দুল লতিফের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। তিনি বর্তমানে সিলেটস্থ দিরাই-শাল্লা উন্নয়ন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে বৃহত্তর দিরাই-শাল্লা অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন।
বিশেষ করে এলাকার মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, শিক্ষা বিস্তার এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে প্রবাসী ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সংগঠনের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও জনমুখী করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বর্তমানে তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনের সূতিকাগার জগদল আল ফারুক উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যে প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর নেতৃত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ সেই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও অগ্রগতির দায়িত্বও তিনি পালন করছেন।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি ইতিবাচক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই, আর সেই কারণেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতায় শেখ আব্দুল লতিফ বিশ্বাস করেন, উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং সামাজিক সম্প্রীতির জন্য জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তিনি মনে করেন, নেতৃত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং সমাজকে ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নেওয়া।
ছাত্রনেতা থেকে রাজনৈতিক সংগঠক, সামাজিক কর্মী থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক—বহুমাত্রিক এই পথচলায় শেখ আব্দুল লতিফ নিজেকে সবসময় জনগণের একজন সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতি, সমাজসেবা ও শিক্ষা উন্নয়নে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে দিরাই-শাল্লা অঞ্চলের পরিচিত মুখ এবং অভিজ্ঞ সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নেতৃত্ব, সংগঠন ও জনসেবার এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি এখনো সক্রিয় রয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এই কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তাঁর সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা।










