বালেন্দ্র শাহের চমক, নেপালের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
নেপালের চলমান সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ভোট গণনায় কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও র্যাপার–তরুণ রাজনীতিক বালেন্দ্র (বালেন্দ্র) শাহ অভূতপূর্ব চমক দেখাচ্ছেন। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তাঁর দল জাতীয় রাজনীতিের বড় বড় দলকে পেছনে ফেলে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে এবং এককভাবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথেও তারা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। জাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি যেখানে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছেন, সেখানে বালেন্দ্র শাহ ক্রমান্বয়ে তাঁর ব্যবধান বাড়িয়ে নিচ্ছেন, যা নেপালের তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তরুণদের ভরসার নতুন মুখ
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতিবিরোধী মনোভাবের পুঁজি করে তরুণদের কাছে এক ভিন্নধারার নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে ২০২২ সালে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে অপ্রত্যাশিত জয়ের পর থেকেই তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকল্প হিসেবে আলোচনায় আসেন এবং ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়েন। বিশ্লেষকদের মতে, শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রভাব এবং দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য—সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে তিনি ‘অ্যান্টি–এস্টাবলিশমেন্ট’ এক প্রবল শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
র্যাপার থেকে জনপ্রিয় রাজনীতিক
বালেন্দ্র শাহ মূলত নেপালি হিপ–হপ বা ‘নেফহপ’ অঙ্গনের পরিচিত মুখ হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। ২০১৩ সালের দিকে আন্ডারগ্রাউন্ড র্যাপ ব্যাটল ও অনলাইন মিউজিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন; ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘বলিদান’সহ তাঁর বেশ কিছু গানে দুর্নীতি, বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা উঠে আসে, যা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক বার্তাবহ এই গানগুলোই পরে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য ভিত্তি তৈরি করে, কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা তরুণরা তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে মেলাতে শুরু করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বালেন্দ্র শাহ দ্রুতই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্স (টুইটার)–এ তাঁর মিলিয়ন ঘর ছুঁই–ছুঁই অনুসারী, যা তাঁকে প্রচলিত দলগুলোর তুলনায় ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি ও দ্রুত যোগাযোগের এক বড় সুবিধা দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারপর্বে লাইভ ভিডিও, র্যাপ পারফরম্যান্স ও পথসভায় তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছতা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে তরুণদের ‘চেঞ্জ–ক্যাম্পেইন’-এ যুক্ত করেন।
কাঠমান্ডুর মেয়র থেকে জাতীয় মঞ্চে
২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডু মহানগরীর মেয়র পদে জয় নিয়ে বালেন্দ্র শাহ নেপালের মূলধারার রাজনীতিতে ঝড় তোলেন। তিনি তখন দুই প্রধান দল—নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন–ইউএমএল–এর প্রার্থীদের বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে রাজধানীর কর্পোরেশন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। মেয়র হিসেবে তাঁর মেয়াদকালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, সড়ক ও যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগ্রাসী অবস্থান দেশজুড়ে আলোচিত হয়; একই সঙ্গে রূঢ় ব্যবহারের অভিযোগ, হকারদের উচ্ছেদ ও বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন নিয়ে কঠোরতা তাঁকে বিতর্কের মুখেও ফেলে।
২০২৬ সালের শুরুতে তিনি মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় রাজনীতির নবীন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া দল জাতীয় স্বাধীনতা পার্টিতে (জাতীয় স্বাতন্ত্র্য পার্টি–ধাঁচের একটি শক্তি) যোগ দেন এবং এ দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে সাধারণ নির্বাচনে মাঠে নামেন। এ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন দল যে পরিমাণ আসনে এগিয়ে আছে, তা নেপালের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দলগুলোর রাজনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে ধরা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সরকার গঠনের সমীকরণেও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতীয় সিনেমা নিষেধাজ্ঞা বিতর্ক
বালেন্দ্র শাহের নাম নেপাল–ভারত সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির আলোচনাতেও বারবার উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভারতীয় সিনেমা ‘আদিপুরুষ’-এ সীতাকে ভারতের কন্যা হিসেবে উল্লেখ করা সংলাপকে ঘিরে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং কাঠমান্ডু মহানগর এলাকায় সব হিন্দি সিনেমা প্রদর্শন বন্ধের ঘোষণা দেন। ওই সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘জনকী (সীতা) নেপালের কন্যা’—এই ঐতিহাসিক–ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করে কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে না এবং বিতর্কিত সংলাপ না বদলালে হিন্দি ছবি চলবে না।
তাঁর এই অবস্থানের পর নেপালজুড়ে ‘আদিপুরুষ’ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে; অনেক হল সকালবেলার শো বাতিল করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সমর্থনে তরুণদের নানা বিক্ষোভও দেখা যায়। পরে চলচ্চিত্র নির্মাতারা সংলাপ পরিবর্তন করলেও আইনি ও কূটনৈতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে বালেন্দ্র শাহ কিছু সময় পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন, যা তাঁকে একদিকে জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রশংসা এনে দেয়, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিচার বিভাগের সঙ্গে টানাপোড়েন বাড়িয়ে দেয়।
সামনে কী দেখছেন বিশ্লেষকরা
নেপালের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বালেন্দ্র শাহ ও তাঁর দলের এই উত্থান দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী দল–নির্ভর রাজনীতির ওপর তরুণ ভোটারদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। প্রাথমিক ফলাফল চূড়ান্ত হলে, তিনি সংসদে বড় একটি ব্লক গঠন করে সরকারের নেতৃত্বে আসার কিংবা জোট রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তবে তাঁর তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতা, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান ভবিষ্যতে নীতি–নির্ধারণে কতটা স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে









