বাংলাদেশিসহ ৫ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দিল স্পেন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অনেক দেশ যখন সীমান্তে কড়াকড়ি আর অভিবাসী বহিষ্কার নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটল স্পেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির অংশ হিসেবে দেশটি প্রায় পাঁচ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবার স্পেন সরকার এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এর মাধ্যমে এত দিন ‘অদৃশ্য’ হিসেবে পরিচিত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনা হচ্ছে—যারা বাস্তবে স্পেনের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকার ‘রাজকীয় ডিক্রি’ বা বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারির উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরপরই কোনো দীর্ঘ সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই এটি কার্যকর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়; বরং ইউরোপের কোনো একক রাষ্ট্রে গৃহীত অন্যতম বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে স্পেন নিজেকে আরও স্পষ্টভাবে অভিবাসীবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করল।
একবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে এত বড় পরিসরে অভিবাসী বৈধতার নজির খুব কম। আগে ইতালি ও গ্রিস সীমিত আকারে কিছু খাতে নিয়মিতকরণ করলেও, স্পেনের এই ডিক্রি গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে পর্যটন, কৃষি এমনকি হাই-টেক স্টার্টআপ খাত পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। এটি ২০০৫ সালের বহুল আলোচিত ‘সাপাতেরো নিয়মিতকরণ’ কর্মসূচিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই ঘোষণায় বার্সেলোনা, মাদ্রিদ ও ভালেন্সিয়ার মতো শহরে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি পরিবারের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
বর্তমানে স্পেনে ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন বৈধ কাগজপত্রের অভাবে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের ফলে সরাসরি ১৫ থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি উপকৃত হতে পারেন। পর্যটন, কৃষি ও খুচরা ব্যবসা খাতে কর্মরত এসব প্রবাসী এখন বৈধ শ্রম চুক্তি, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং নির্বিঘ্নে দেশে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ ‘ছায়া শ্রমিক’ সুরক্ষিত নাগরিক জীবনে প্রবেশ করবেন।
স্পেন সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে স্পষ্ট অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দেশটির কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন। সরকার আশা করছে, এই নিয়মিতকরণের ফলে বছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ইউরো কর ও সামাজিক নিরাপত্তা অনুদান কোষাগারে যোগ হবে।
বিশেষ করে নির্মাণ খাত, বয়স্কদের সেবা ও যত্নখাতে যে তীব্র শ্রমসংকট রয়েছে, তা কমাতে এই ডিক্রি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—যেখানে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই বড় অবদান রেখে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও তার মিত্র পদেমোস দলের নেওয়া এই রাজকীয় ডিক্রিকে অনেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখছেন। সংসদীয় ভোট এড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিরোধীদের বাধা দেওয়ার সুযোগ কমে গেছে। ফলে অনিশ্চয়তায় থাকা পাঁচ লাখ মানুষের জন্য বৈধতার দরজা কার্যত সঙ্গে সঙ্গেই খুলে যাচ্ছে।













