জয়শঙ্করের ঢাকা সফর: কেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সঙ্গে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বৈঠক করেন। ছবি- সংগৃহীত।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফর ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ না হওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সামনে আসছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা স্বল্প সময়ের সফরে ঢাকায় আসেন। ভারত ছাড়াও পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিরা জানাজা ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সফররত প্রতিনিধিদের মধ্যে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক এবং নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হয়েছে। তবে ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার কোনো বৈঠক হয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়াই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সফরটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। এই সময়ের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক না হলেও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে এস জয়শঙ্করের আলাপ হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, এই সফরকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ঠিক হবে না। তার মতে, সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল শোক প্রকাশ ও সৌজন্য রক্ষা। তিনি বলেন, সময়সূচির সীমাবদ্ধতার কারণে একান্ত বৈঠকের সুযোগ তৈরি হয়নি এবং উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের মধ্যে কেবল সৌজন্য বিনিময় হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতি নিজেই একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখার কারণ নেই; সময় ও প্রটোকল—দুই দিক থেকেই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার মতে, ভারতের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে, বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তাও আলোচনায় এসেছে। শোকবার্তায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ উল্লেখ করায় কূটনৈতিক মহলে এটিকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যতে কাজ করার আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে, যদিও একে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
খালেদা জিয়ার জানাজায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, সেটিও এই সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই উদ্যোগ যোগাযোগের একটি বার্তা দিলেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত গতিপথ নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনের পর গঠিত সরকার।













