বিশেষ সম্পাদকীয়
চরম ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: মোকাবেলার প্রস্তুতি কতটা বাস্তবসম্মত?
আজকের ভূমিকম্পটি মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল, কিন্তু সেই কয়েক মুহূর্তই সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে গভীরভাবে। এ পর্যন্ত ৬ জনের প্রাণহানি এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক, ভবনে ফাটল, আহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া—সবই আবারও স্পষ্ট করে দিল, ভূমিকম্প বাংলাদেশের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় দুর্যোগগুলোর একটি। এই ঘটনাটি কেবল সকালের রুটিন ভাঙেনি, দেশের প্রস্তুতি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির অঞ্চলেই অবস্থিত। দেশের চারপাশে মধুপুর ফল্ট, দাউকি ফল্ট, সিলেট-আসাম সিসমিক বেল্ট এবং আরাকান ফল্ট—এসব সক্রিয় ভূকম্পন উৎস রয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে, এগুলোর যেকোনো একটি বৃহৎ স্লিপ ঘটালে ৬ থেকে ৭.৫ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প হতে পারে, যা জনবহুল বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে ঢাকার পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ শহরটি নরম মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, বহুতল ভবনে ভরপুর এবং অধিকাংশ ভবনের নির্মাণমান প্রশ্নবিদ্ধ।
বাস্তবতা হলো—দেশে বিল্ডিং কোড থাকলেও তা মানার প্রবণতা কম। হাজার হাজার ভবন নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। পুরোনো ভবনগুলোর রেট্রোফিটিং বা শক্তিবৃদ্ধির কোনো কার্যকর কর্মসূচি চালানো হয়নি। ভরাট জমিতে নির্মিত বহুতল ভবনগুলো যে কোনো বড় ভূমিকম্পে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঢাকার সংকীর্ণ সড়ক, খালি জায়গার অভাব, জনঘনত্ব—সবকিছু মিলে উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলবে সেটি আজকের পরিস্থিতিতেই অনুমান করা যায়।
আজকের ভূমিকম্পের পরই হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়তে থাকে। ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুরসহ প্রত্যন্ত এলাকার হাসপাতালগুলোতে আহত রোগীর দীর্ঘ লাইন প্রমাণ করে দেয়—জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও আমাদের সক্ষমতা সীমিত। ট্রমা কেয়ার ইউনিটের ঘাটতি, বিশেষায়িত চিকিৎসকের অভাব এবং পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির সংকট বড় ধরনের দুর্যোগে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
যদিও জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, সিটি করপোরেশন পর্যায়ের কন্টিনজেন্সি প্ল্যান, স্কুল-ভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি—এসব উদ্যোগ কাগজে-কলমে আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন এখনো আশানুরূপ নয়। ভূমিকম্প প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নিয়মিত মহড়া, জরুরি তথ্য প্রচার, কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ—এসব কিছুই এখনো সীমিত পরিসরে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। বাংলাদেশ বিল্ডিং কোডের হালনাগাদ সংস্করণ প্রণীত হয়েছে, যেখানে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি ভবনগুলোর রেট্রোফিটিংয়ের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। কিছু এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি এবং মহড়া আয়োজন করা হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই উন্নতির ইঙ্গিত বহন করে—কিন্তু দেশের জনসংখ্যা, নগরায়ণের চাপ এবং অবকাঠামোর বাস্তবতা বিবেচনায় এগুলো যথেষ্ট নয়।
প্রধান প্রশ্নটি এখন একটিই—বাংলাদেশ কি একটি বড় ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত? আজকের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রস্তুতি আছে, কিন্তু তা অসম্পূর্ণ; পরিকল্পনা আছে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়; সংকল্প আছে, কিন্তু বাস্তবায়নে গতি কম। একটি বড় দুর্যোগ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হলো আগাম প্রস্তুতি এবং কঠোর নিয়ম প্রয়োগ। ভবন নির্মাণবিধি বাস্তবায়নে কঠোরতা, পুরোনো ভবনের রেট্রোফিটিং, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, উদ্ধার সংস্থাগুলোকে আধুনিকীকরণ এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি—এসব পদক্ষেপ এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং সময়ের দাবি।
ভূমিকম্প কোনো সতর্কতা দিয়ে আসে না। কিন্তু ক্ষতি কমানোর ক্ষমতা মানুষের হাতেই। আজকের অভিজ্ঞতা যদি আমাদের চোখ খুলে দেয়, তবে এই ক্ষণিকের কাঁপুনি ভবিষ্যতের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরির সুযোগ হতে পারে। দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এবং সাধারণ মানুষ—সবারই এখন প্রয়োজন সত্যকে স্বীকার করা, এবং প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আর কোনো শিথিলতা না রাখা। কারণ প্রশ্নটি শুধু ভবনের নয়, মানুষের জীবনরক্ষার।










