নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা: রাজনৈতিক অনৈক্যে সংশয় গভীর হচ্ছে
▪️ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক আয়োজন নয়—এটি এখন জাতীয় স্থিতিশীলতা ও গণবিশ্বাসের পরীক্ষা।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অচলাবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির ফলে নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। রাজনীতির সব অঙ্গনেই এখন এক প্রশ্ন ঘুরছে— “নির্বাচন আদৌ হবে তো?” (সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ৭ নভেম্বর ২০২৫)
জাতীয় পার্টির একাংশের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন, দেশের মানুষ এখনো নিশ্চিত নন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে কি না। রাজধানীর গুলশানে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে—এই সংশয় দূর করা এখন সবচেয়ে জরুরি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। যদি কোনোভাবে অংশগ্রহণ ব্যাহত হয়, তাহলে দেশ আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে। (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ৮ নভেম্বর ২০২৫)
রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে প্রণীত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এখন রাজনৈতিক অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার পরও সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও গণভোটের সময় নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি দলগুলো। বিএনপি ও কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে গণভোটের পক্ষে থাকলেও জামায়াত ও এনসিপি আগে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। এই মতবিরোধের কারণে জুলাই সনদ ফাইলবন্দি হয়ে আছে। (সূত্র: সমকাল, ৬ নভেম্বর ২০২৫)
রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন চরমে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্ষমতা ও অবস্থান ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় একে অপরকে ঘায়েল করার প্রবণতা বেড়েছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব, প্রতিহিংসা ও সমঝোতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, “এখনকার রাজনীতি মতাদর্শ নয়, বরং প্রতিশোধের জায়গা থেকে পরিচালিত হচ্ছে।” (সূত্র: বিডিনিউজ২৪ ডটকম, ৭ নভেম্বর ২০২৫)
বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহলও। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) সরাসরি জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘও জানিয়েছে, “বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই টেকসই গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।” (সূত্র: ডয়চে ভেলে বাংলা, ৯ নভেম্বর ২০২৫)
দেশজুড়ে অপরাধ ও সহিংসতা বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চুরি, নারী নির্যাতন ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ বেড়েছে। মাঠ প্রশাসনে চলছে আতঙ্ক ও অস্থিরতা। নির্বাচনের চার মাস বাকি থাকলেও নির্বাচন কমিশন এখনো মাঠ প্রশাসন সাজাতে পারেনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সচিব পদ শূন্য থাকা—এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ নভেম্বর ২০২৫)
নির্বাচনের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামেও নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি খুন, অপহরণ ও গোলাগুলির ঘটনা বেড়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সেখানে সক্রিয় আরাকান আর্মি বাংলাদেশের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ৯ নভেম্বর ২০২৫)
সরকারি মহল সাতদিনের আল্টিমেটাম দিলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ চলছে। অনেকেই মনে করছেন, একটি শক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচন বিলম্বিত করতে চাইছে, কারণ তারা এখন ক্ষমতার স্বাদ পাচ্ছে এবং নির্বাচন হলে সেই অবস্থান হারাতে পারে। এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মন্তব্য— “এখন নির্বাচন নয়, ক্ষমতায় টিকে থাকাই বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।” (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ নভেম্বর ২০২৫)
যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, তবুও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—একটি অংশগ্রহণমূলক, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। নাগরিক সমাজের অনেকে বলছেন, “নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। জনগণ এবারও পথ দেখাবে, যদি রাজনীতিকরা সংলাপে ফিরে আসে।” (সূত্র: আমাদের সময়, ৯ নভেম্বর ২০২৫)
নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক জটিলতা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ তত গভীর হচ্ছে। যদি নভেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে দেশ গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে গিয়ে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক আয়োজন নয়—এটি এখন জাতীয় স্থিতিশীলতা ও গণবিশ্বাসের পরীক্ষা।










