রাজধানীতে দুর্বৃত্তের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ মামুন: কে এই মামুন?
▪️ হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি, ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন মামুন। ▪️খুন হওয়ার আগে আদালতে হাজিরা দেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন
রাজধানীর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে সোমবার (১০ নভেম্বর) সকাল আনুমানিক ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তারিক সাঈফ মামুন (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামুন হাসপাতালের প্রধান ফটক পার হয়ে রাস্তায় উঠতেই দুইজন মুখোশধারী বন্দুকধারী খুব কাছ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে আশপাশের লোকজন ও হাসপাতালের কর্মীরা দৌড়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢামেকের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে গুলির মুহূর্ত
ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ফুলহাতা টি-শার্ট পরা মামুনকে লক্ষ্য করে দুই ব্যক্তি সিনেমার দৃশ্যের মতো কাছে এসে গুলি করছে। তিন থেকে চার সেকেন্ডের মধ্যেই তারা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশের ধারণা, হত্যাকারীরা মোটরসাইকেলযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, “প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি নিহত ব্যক্তি তারিক সাঈফ মামুন। তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ চলছে, দ্রুত অভিযুক্তদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।”
পরিবারের দাবি—তিনি সাধারণ মানুষ
নিহতের খালাতো ভাই হাফিজ বলেন, “আমার ভাই একজন সাধারণ মানুষ। তিনি কোনো রাজনীতি বা অপরাধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। কারা তাকে হত্যা করেছে বা কেন হত্যা করেছে আমরা কিছুই জানি না।” নিহতের স্ত্রী বিলকিস আক্তার জানান, আজ সকালে আদালতে তার হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। সে উদ্দেশে সকালে তিনি বাসা থেকে বের হন। বিলকিসের ধারণা, “পুরোনো শত্রুতার জেরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন গ্রুপের লোকজন এই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, কারণ এর আগেও তারা একাধিকবার হত্যাচেষ্টা করেছিল।”

কে এই তারিক সাঈফ মামুন
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, নিহত তারিক সাঈফ মামুন একসময় কুখ্যাত সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনের সহযোগী ছিলেন। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকায় তাদের ‘ইমন–মামুন’ বাহিনী একসময় আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। এই দুজনই ছিলেন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি।
২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে মামুনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়েছিল। সেই গুলি লেগেছিল মোটরসাইকেল আরোহী ভুবন চন্দ্র শীলের মাথায়, যিনি পরে মারা যান। পুলিশ জানিয়েছিল, ওই হামলাটি চালিয়েছিল কারাবন্দি ইমন গ্রুপের সদস্যরা। ঘটনার পর মামুন কিছুদিন পলাতক থেকে কারাগারে ছিলেন এবং সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান।
পুরোনো দ্বন্দ্বেই শেষ পরিণতি?
পুলিশ ধারণা করছে, ইমন ও মামুনের মধ্যে পুরোনো অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধই এই হত্যার মূল কারণ হতে পারে। একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “দুজনই একই অপরাধচক্রে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল দীর্ঘদিন। এই হত্যাকাণ্ড সেই দ্বন্দ্বেরই অংশ হতে পারে।”
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তারিক সাঈফ মামুনের জন্ম ১৯৭০ সালে এবং স্থায়ী ঠিকানা লক্ষ্মীপুর জেলায়। তিনি দীর্ঘদিন রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, নিহত ব্যক্তির লাশ মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি সূত্রাপুর থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। সূত্রাপুর থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকারীদের শনাক্তে কাজ চলছে।”
লালবাগ বিভাগের ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন আরও বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত। পূর্ববিরোধের সূত্রেই এটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। ঘটনাটির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে আমরা একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।”
পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন তারিক সাঈফ মামুন। নিহত ব্যক্তি অতীতে ঢাকার আলোচিত অপরাধচক্র ‘ইমন–মামুন বাহিনী’র অন্যতম নেতা ছিলেন এবং একাধিক হত্যা মামলার আসামি। পরিবারের দাবি, তিনি আর অপরাধজগতে সক্রিয় ছিলেন না। পুলিশ বলছে, এটি পুরোনো দ্বন্দ্বের জের ধরে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে।










