সহিংসতা ঠেকাতে ‘প্লা প্রোয়া’ চালু
কাতালোনিয়ায় ৩৪টি সহিংস তরুণ গোষ্ঠী শনাক্ত, নজরদারিতে প্রায় এক হাজার ব্যক্তি
কাতালোনিয়ায় তরুণদের সহিংস গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা মোকাবিলায় নতুন বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আঞ্চলিক পুলিশ মোসোস দে’স্কোয়াদ্রা। পুলিশের হিসাবে, অঞ্চলটিতে অন্তত ৩৪টি সহিংস তরুণ গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে এবং প্রায় এক হাজার ব্যক্তি এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত। তাদের বিস্তার ঠেকানো, অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ প্রতিরোধের লক্ষ্যে আগামী নভেম্বর থেকে ‘প্লা প্রোয়া’ (Pla Proa) নামে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা কার্যকর করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
২২ অক্টোবর বার্সেলোনার কাছে সাবাদেল শহরে মোসোস দে’স্কোয়াদ্রার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদমাধ্যমকে পরিকল্পনার বিষয়ে জানান বাহিনীর প্রধান সিলভিয়া কাতা, উপপ্রধান রামন চাকোন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তনি রদ্রিগেস। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে বার্সেলোনা ও আশপাশের এলাকায় তরুণদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোষ্ঠীগত সহিংসতা বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ ২০২৪ সাল থেকে এসব গোষ্ঠী নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে।
তিনটি গোষ্ঠীকে ঘিরে অধিকাংশ সংঘর্ষ
পুলিশের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ত্রিনিতারিওস (Trinitarios), বারিও ১৮ (Barrio 18) এবং লস ৩০০ (Los 300) নামের তিনটি গোষ্ঠী। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, শনাক্ত করা গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধমূলক ঘটনার প্রায় ৬৬ শতাংশের সঙ্গে এই তিনটি গোষ্ঠীর যোগসূত্র রয়েছে।
এ ছাড়া লাতিন কিংস (Latin Kings), পিজিএস (PGS), লোবোস (Lobos) এবং মারা সালভাত্রুচা (Mara Salvatrucha) সহ মোট সাতটি গোষ্ঠীকে প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রম প্রধানত বার্সেলোনা ও এর মহানগর এলাকায় কেন্দ্রীভূত। পাশাপাশি তারাগোনা, জিরোনা ও লেইদা অঞ্চলেও তাদের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। বার্সেলোনার কয়েকটি পাড়া, জনসমাগমস্থল এবং মেট্রোর কিছু অংশে গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে পুলিশের উদ্বেগ রয়েছে।
হামলা, ডাকাতি ও অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ
মোসোস দে’স্কোয়াদ্রার তথ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের মধ্যে রয়েছে মারামারি, শারীরিক হামলা, নিজেদের সদস্যদের ওপর শাস্তিমূলক আক্রমণ, ছিনতাই ও ডাকাতি, মাদক বিক্রি এবং ছুরি বা আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ঘটনা।
পুলিশের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, সাম্প্রতিক সময়ে সহিংস সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। গত দুই বছরে কাতালোনিয়ায় অন্তত তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত করেছে পুলিশ। তবে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে গ্যাং-সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন দাবি করা হয়নি।
পুলিশের পর্যবেক্ষণে, এসব গোষ্ঠীতে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় বয়সের মানুষ রয়েছে। কিশোরদের কেউ কেউ গোষ্ঠীর প্রতীক বা পরিচিতি ব্যবহার করলেও সবাই সরাসরি সক্রিয় সদস্য নয়। পুলিশ তাদের মধ্যে গোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল, প্রতীক ব্যবহারকারী এবং সক্রিয়ভাবে সহিংসতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার চেষ্টা করছে।
আগের গ্যাংগুলোর চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন
২০০০ সালের শুরুর দিকে কাতালোনিয়ায় তথাকথিত লাতিন গ্যাংগুলোর উত্থান হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পুলিশের অভিযানে তাদের কার্যক্রম অনেকটাই কমে আসে। কিন্তু মোসোস দে’স্কোয়াদ্রার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের গোষ্ঠীগুলোর কাঠামো আগের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময় ও নমনীয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান গোষ্ঠীগুলোকে শুধু নির্দিষ্ট জাতীয়তা বা অভিবাসী পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের সদস্যদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি ভিন্ন হতে পারে এবং নেতৃত্বের কাঠামোও সব ক্ষেত্রে এক রকম নয়। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ, নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার প্রবণতা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
কীভাবে কাজ করবে ‘প্লা প্রোয়া’
নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য শুধু অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা নয়, বরং গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ এবং নতুন গোষ্ঠীর বিস্তার আগেই ঠেকানো।
এ জন্য কাতালোনিয়ার প্রতিটি পুলিশ অঞ্চলে আলাদা সমন্বয় টেবিল বা তথ্য বিনিময়ের কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অঞ্চলের তথ্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একত্র করে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে। সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তদন্ত, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।
বার্সেলোনায় এ কাজে নগর পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে। যেসব চত্বর, জনসমাগমস্থল বা মেট্রো এলাকায় সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর উপস্থিতির তথ্য রয়েছে, সেখানে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
মোসোস দে’স্কোয়াদ্রার লক্ষ্য হলো, বর্তমানে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা বন্ধ করা এবং নতুন গোষ্ঠী গড়ে ওঠা প্রতিরোধ করা। তবে পরিকল্পনাটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্য সংগ্রহের মান, পুলিশি সমন্বয় এবং অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের সহায়তা দেওয়ার ওপরও।
| তথ্যসূত্র: Europa Press, 3CatInfo, El País, El Periódico, betevé











