বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি সরকারি তথ্যের ঘাটতিতে দালাল-এজেন্সির দাপট

আহমাদুল কবির মালয়েশিয়া প্রকাশিত: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০২ পিএম
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি সরকারি তথ্যের ঘাটতিতে দালাল-এজেন্সির দাপট

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে। এতে বিদেশে যেতে আগ্রহী হাজারো তরুণের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বাজার খোলার আগেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রায় এক মাস আগে প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে সেই তথ্য যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশ এখনো জানেন না কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।

তথ্যের এই শূন্যস্থানই দখল করেছে রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রচার, চাকরির আশ্বাস এবং দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করছেন। ফলে সরকারি ঘোষণার চেয়ে দালালের কথাই অনেকের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা না দিতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলেছে। কিন্তু এই সতর্কবার্তার মধ্যেই কিছু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও দালালের কার্যক্রম থেমে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণায় সরগরম চাকরির বাজার। তরুণরা ছুটছেন তাদের দেওয়া আশ্বাসে, সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে নয়।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিদেশে চাকরিতে যাওয়ার শুরু থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত একজন কর্মীকে নিজ দেশেই নানা ধরনের হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মিথ্যা আশ্বাস, তথ্য গোপন, যখন-তখন টাকা দাবি, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা পাসপোর্টের অপব্যবহারের অভিযোগও নতুন নয়।

এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্রের ওটিপি নিয়ে অভিযোগ। কর্মীদের অভিযোগ, এজেন্ট বা দালালের দাবি করা অর্থ পরিশোধ না করলে বিমানবন্দরে বহির্গমন ছাড়পত্রের ওটিপি পাওয়া যায় না। ফলে বিদেশে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও কর্মীকে অর্থ দিতে বাধ্য হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, কর্মীর পরিবর্তে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালের কাছে ওটিপি নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে একধরনের নতুন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

এসব অনিয়ম একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর বিভিন্ন স্তরে যথাযথ নজরদারি ও প্রয়োগের ঘাটতির কারণে অনেক অনিয়মই কার্যত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার রূপ নিয়েছে। আইন ও বিধিবিধান থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল হলে অনিয়মের সংস্কৃতি যে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার তার বড় উদাহরণ।

তথ্য না দিলে দালালের দখল

নাগরিককে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য না দিলে শুধু প্রতারণার ঝুঁকিই বাড়ে না, সচেতন হওয়ার সুযোগও কমে যায়। মালয়েশিয়া সরকার তাদের নিজস্ব ব্যবস্থায় কর্মী নিয়োগের ধাপ প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ডেকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল একই তথ্য দ্রুত, সহজ ভাষায় এবং সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা। কারণ সরকারি তথ্যের জায়গা ফাঁকা থাকলে সেই জায়গা অন্যরা দখল করবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। কিন্তু কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। কয়েক বছর পরপর নানা অভিযোগে বাজার বন্ধ হয়েছে, পরে সরকারের তৎপরতায় আবার খুলেছে। আবার অনিয়মের অভিযোগে বন্ধও হয়েছে। ভিসা কেনাবেচা, দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিমান টিকিটে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।

এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ কর্মীকে। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত অনেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন। কেউ কেউ আবার অনিয়মিত অবস্থায় থেকে আরও বড় ঝুঁকিতে পড়েছেন।

৩৩৮ এজেন্সি নিয়ে প্রশ্ন

এবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে। তালিকায় রয়েছে ২৫টি প্রধান এজেন্সি, ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড—বোয়েসেলের সঙ্গে ৬২টি এজেন্সি।

প্রশ্ন উঠেছে, ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি কি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি তারা ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীনেই সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে?

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতায় সহযোগী এজেন্সিগুলো নিজেরা কর্মী পাঠাতে না পারা এবং প্রধান এজেন্সির ওপর নির্ভরশীল থাকার অভিযোগ রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তালিকায় থাকা কিছু এজেন্সির মালয়েশিয়ার শর্ত অনুযায়ী তিন বছর কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা নেই। কারও কারও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতাই নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। কিছু প্রধান এজেন্সির বিএমইটি ছাড়পত্রের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, ৩৩৮টি এজেন্সি বাংলাদেশ নির্বাচন করেনি; মালয়েশিয়া তাদের নিজস্ব শর্ত অনুযায়ী তালিকা করেছে। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় কোন কোন বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়ারই নির্বাচন করার এখতিয়ার রয়েছে।

খরচ কত সরকারি তথ্য কোথায়?

এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন কর্মী পাঠাতে প্রকৃত খরচ কত হবে। এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা না থাকায় বাজারে নানা ধরনের অঙ্ক ঘুরছে।

বিদ্যমান সমঝোতা অনুযায়ী মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা মালয়েশিয়া প্রান্তের খরচ, অর্থাৎ অভিবাসন লেভি ও বিমান টিকিট বহন করার কথা। বাংলাদেশ প্রান্তে বিএমইটি ছাড়পত্রের নির্ধারিত ফি, মেডিকেল স্ক্রিনিং এবং রিক্রুটিং এজেন্সির নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ কর্মীর দেওয়ার কথা।

কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতায় কর্মীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবারও বাজারে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ ধরনের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে সরকার যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিবাসন ব্যয় ঘোষণা করেনি, সেখানে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য কীভাবে বাজারে অর্থ লেনদেনের ভিত্তি হয়ে উঠছে?

শ্রমবাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, সরকারি নির্ধারিত খরচ ও প্রকৃত খরচের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকলে নতুন করে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রধান ও সহযোগী এজেন্সির ভূমিকা স্পষ্ট নয়

দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, প্রধান ও সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকার লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত প্রধান এজেন্সিগুলোই কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে মূল এখতিয়ার পাবে। আর সহযোগী এজেন্সিগুলো বাংলাদেশে কর্মী সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত থাকবে।

কিন্তু এই কাঠামোটি সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। ফলে ৩৩৮ এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পরও চাকরিপ্রত্যাশীরা জানেন না কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কোন পর্যায়ে টাকা দেবেন এবং কোন সেবার জন্য কত টাকা দিতে হবে।

এর মধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থায় বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বোয়েসেলের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ঘোষণা বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে সরকার যেখানে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে পাঠাতে পারে, সেখানে বেসরকারি ব্যবস্থায় কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হবে কেন?

এই উদ্যোগ সফল হলে তা স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের মডেলটি সীমিত ১০ হাজার কর্মীর মধ্যেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে বৃহত্তর নিয়োগ ব্যবস্থায়ও এর প্রতিফলন ঘটবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আইন আছে, বাস্তবতা ভিন্ন

বাংলাদেশের আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী কর্মীদের দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে গিয়ে চাকরি খোঁজার কথা নয়। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমে বিদেশি নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র আসবে, এরপর সরকার অনুমোদন দেবে এবং বিএমইটির ডাটাবেজ থেকে কর্মী বাছাইয়ের ব্যবস্থা থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তবে বিএমইটির ডাটাবেজে নিবন্ধিত কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আইনে ডাটাবেজে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকলে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। তখনই চাকরিপ্রত্যাশীরা এজেন্সির দপ্তরে যেতে পারেন।

বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে চাহিদাপত্র পাওয়ার আগেই কর্মী সংগ্রহ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। পরে বিএমইটি নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ফলে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

বিদেশে চাকরি প্রত্যাশীদের বিএমইটিতে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও সম্ভাব্য কর্মীদের নিবন্ধনে উৎসাহিত করতে সরকারি প্রচার-প্রচারণা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র টিটিসির মাধ্যমেও এ নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট পোর্টাল কি কাজে লাগছে?

সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আইএলও সহযোগিতায় তৈরি ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট পোর্টাল চালু করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চাকরিপ্রত্যাশী, নিয়োগকর্তা, রিক্রুটিং এজেন্সি, বিএমইটি, মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বিত করার সুযোগ রয়েছে।

একজন চাকরিপ্রত্যাশী কোন দেশে কী ধরনের চাকরির সুযোগ রয়েছে, নতুন চাহিদা এসেছে কি না, কোন এজেন্সি কোন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, কী খরচ হবে এবং কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এসব তথ্য এক জায়গায় পেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমতে পারে।

কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পোর্টালটির সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ, সহজ ব্যবহারযোগ্যতা এবং চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বিত তথ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকার পরও বাস্তবে অনেক চাকরিপ্রত্যাশী দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিলালাল বলেন, সরকারি সেবাগুলো যদি মানুষের দোরগোড়ায় থাকে, তাহলে চাকরিপ্রত্যাশীরা কেন দালাল ও এজেন্সির ওপর বেশি নির্ভর করবেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রামরুর গবেষণাতেও দেখা গেছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে কাছের দালালের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করেন। অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন ওকুপের মতে, ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট পোর্টালের উদ্দেশ্য ছিল চাকরিপ্রত্যাশীকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম করা। এটি দ্রুত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে প্রতারণা ও বঞ্চনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্যই হতে পারে দালাল প্রতিরোধের হাতিয়ার

চাকরিপ্রত্যাশীদের নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ গ্রহণের ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা গেলে ঢাকায় এসে অযথা অর্থ খরচের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে টিটিসিগুলোকে শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে নয়, নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তথ্য ও পরামর্শকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কারণ বিদেশি শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াটি যদি একটি চক্রে পরিণত হয় বাজার বন্ধ থাকলে আগাম প্রচারণা, চাহিদা তৈরি ও অর্থ সংগ্রহ এবং বাজার খুললে তাড়াহুড়ো করে কর্মী পাঠানো তাহলে পুরোনো সংকটই নতুন করে ফিরে আসবে।

শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, সেই সংখ্যাকে সাফল্যের মাপকাঠি করলে চলবে না। কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কতটা নিরাপদে এবং কতটা দক্ষ কর্মী বিদেশে গেলেন সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মানদণ্ড।

এবার কার স্বার্থে খুলবে বাজার?

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু নতুন করে বাজার খোলার খবর নয়; এটি পুরোনো ভুল থেকে বেরিয়ে আসার বড় পরীক্ষা। ভবিষ্যতে জাপানের মতো নিয়মিত ও উন্মুক্ত ব্যবস্থায় যোগ্য সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য কর্মী প্রেরণের সুযোগ রাখা যায় কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। শ্রমবাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত কর্মী প্রেরণ চালু রাখতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কোনো অনিয়মের চাপের কাছে সরকারি প্রতিষ্ঠান যেন নীরব বা নিষ্ক্রিয় হয়ে না পড়ে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

নতুন সরকারের নতুন অধ্যায়ের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশের নেগোসিয়েশন ও কার্যকর তৎপরতার ওপর। আর সেই নেগোসিয়েশনের শক্তি নির্ভর করবে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর। অনিয়ম অব্যাহত থাকলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানও দুর্বল হতে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ কমিটির সভার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ধরনের বৈঠকে শ্রম নিয়োগের প্রক্রিয়া, খরচ, সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও কর্মী সুরক্ষাসহ খুঁটিনাটি বিষয় আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ বছর এখন পর্যন্ত যৌথ কমিটির সভা না হওয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার খুলবে কর্মীর স্বার্থে, নাকি আবারও খুলবে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের স্বার্থে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার সত্যিই কতটা ‘নতুন’।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ চায় ডিসিসিআই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৬ এম
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ চায় ডিসিসিআই

বাংলাদেশের জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

বৃহস্পতিবার কুয়ালালামপুরের একটি হোটেলে মালয়েশিয়ার উপ-অর্থমন্ত্রী লিউ চিন টংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব আহ্বান জানান।

সাক্ষাৎকালে তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুই দেশের বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি এবং সরকার পর্যায়ে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। পারস্পরিক আস্থা, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি জ্বালানি সরবরাহ, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা ও বিনিয়োগ সহায়ক বিভিন্ন সুবিধা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন।

এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে মালয়েশিয়া সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা আরও কার্যকর ও টেকসই করা সম্ভব বলে মত দেন।

এ সময় মালয়েশিয়ার উপ-অর্থমন্ত্রী লিউ চিন টং বলেন, দেশটির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাইন্যান্সিংয়ের সম্প্রসারণ, উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্য তৈরি এবং কার্যকর আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও মডেল বাংলাদেশের জন্য অনুসরণযোগ্য হতে পারে।

সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) খাতের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের এমএফএস মডেল বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। মালয়েশিয়াও বাংলাদেশের এ খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।
ডিসিসিআই সভাপতি আরও বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করে। ফলে দেশটি একটি বড় ও সম্ভাবনাময় ভোক্তা বাজারে পরিণত হয়েছে। এই বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার রপ্তানিকারকদের বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

তিনি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব জোরদার, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
সাক্ষাৎকালে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী ও সহ-সভাপতি সালিম সোলায়মান উপস্থিত ছিলেন।

অক্টোবরে শুরু হবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫১ পিএম
অক্টোবরে শুরু হবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। প্রথম দফার আলোচনায় দুই দেশের বাজারসুবিধা, ব্যবসার সুযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।

বৃহস্পতিবার কুয়ালালামপুরে এ তথ্য জানিয়েছেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী। একই দিন মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমআইটিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদও ঢাকায় অক্টোবরের শেষ দিকে প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি হবেন এমবিএফটিএ আলোচনায় মালয়েশিয়ার প্রধান আলোচক।

ড. রশিদি সাইদ বলেন, প্রথম দফার আলোচনায় দুই দেশ নিজেদের প্রয়োজন চিহ্নিত করার পাশাপাশি একে অপরকে কী ধরনের বাণিজ্যসুবিধা দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করবে। বাজারে প্রবেশাধিকার ও ব্যবসার নতুন সুযোগসহ পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে। পরবর্তী বৈঠকগুলো চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত চলবে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে এফটিএ স্বাক্ষরের জন্য ২০২৭ সালের ডিসেম্বরকে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবরে ঢাকায় প্রথম দফার আলোচনা চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের সরকারপ্রধান এফটিএ আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন। ওই সফরের যৌথ বিবৃতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি ব্যাপক, ভবিষ্যৎমুখী ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক এফটিএ সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য থাকলেও পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নেই। ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা এফটিএর আওতায় সম্ভাব্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা, শুল্কছাড় ও বাণিজ্য সহজীকরণের অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছেন না।
এফটিএ হলে দুই দেশের পণ্য ও সেবার বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হতে পারে।

মালয়েশিয়ার সরকারি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা ম্যাট্রেডের ডেপুটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জয় শংকর বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ করতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে মালয়েশিয়া আগ্রহী।
এফটিএ আলোচনার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি উপহাইকমিশনার শানারা মনিকার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় প্রায় ৩০৫ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিট ও ওভেন পোশাক, চামড়া ও পাদুকা, খাদ্য ও পানীয়, শাকসবজি এবং মসলা। অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে খনিজ জ্বালানি, ভোজ্যতেল ও চর্বি, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক, যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য।

এ অবস্থায় এফটিএর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাদুকা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চুক্তিটি ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এফটিএর গুরুত্ব আরও বাড়ছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার কিছু পরিবর্তিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির গুরুত্ব বাড়বে।

এফটিএর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর সুযোগ তৈরি হলে দেশটির বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাতসহ শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও পণ্যের বাণিজ্য কাঠামোও আরও সুসংগঠিত করা সম্ভব হবে।

এদিকে মালয়েশিয়ার হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বেশ কিছু পণ্যকে মালয়েশিয়ার হালাল কর্তৃপক্ষ জাকিম হালাল সনদ দিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু স্বীকৃতি পেলেই হবে না উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, আন্তর্জাতিক হালাল বাজারে আরও কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে কারিগরি দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বৃহস্পতিবার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল হালাল শোকেস (মিহাস) পরিদর্শনকালে তিনি বাংলাদেশের অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল ঘুরে দেখেন। এ সময় প্রাণ, এপেক্স কনভিনিয়েন্স ফুডস লিমিটেড, ঘরের বাজার, প্যারাগন এগ্রো লিমিটেড, তালুকদার এগ্রো ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ, নোরিশ ফুডস লিমিটেড ও বায়োফার্মা লিমিটেডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

এ সময় হাইকমিশনারের সঙ্গে ছিলেন মিহাসের আয়োজক মালয়েশিয়ার সরকারি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা ম্যাট্রেডের ডেপুটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জয় শংকর।

দুই দেশের মধ্যে এফটিএ আলোচনা শুরু হলে বাজারসুবিধা, শুল্ক কাঠামো, পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সহজীকরণের মতো বিষয়গুলো ধাপে ধাপে আলোচনায় আসবে। ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে অক্টোবরের শেষের ঢাকার বৈঠক তাই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় ২২তম মিহাস ফেয়ারে বাংলাদেশের হালাল হাট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:০২ পিএম
মালয়েশিয়ায় ২২তম মিহাস ফেয়ারে বাংলাদেশের হালাল হাট

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হালাল বাণিজ্য প্রদর্শনী ‘মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল হালাল শোকেস’ (মিহাস)-এর ২২তম আসর বসেছে মালয়েশিয়ায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯০টি দেশের প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে এবারের আয়োজনে। প্রায় ২ হাজার ৪০০ বুথে হালাল খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, লজিস্টিকস, ইসলামিক ফাইন্যান্স, প্রযুক্তি ও পর্যটনসহ ১৪টি খাতের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করা হচ্ছে। চার দিনব্যাপী এ আয়োজনে প্রায় ৫০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগমের প্রত্যাশা করছেন আয়োজকরা।

২৩ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে (মাইটেক) অনুষ্ঠিত হচ্ছে মিহাস ২০২৬। প্রদর্শনী ও ব্যবসায়িক ম্যাচমেকিং কর্মসূচির মাধ্যমে এবার ৫ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত বা প্রায় ১২৩ কোটি মার্কিন ডলারের ব্যবসা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০০৪ সালে যাত্রা শুরুর পর মিহাস শুধু হালাল খাদ্যপণ্যের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এটি হালাল অর্থনীতির বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা, আমদানিকারক, পরিবেশক ও ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের পথও তৈরি হচ্ছে।

আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেতে আমাদের Google News ফলো করুন এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য WhatsApp Channel–এ যুক্ত থাকুন।

এবারের মিহাসে অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। মালয়েশিয়া এক্সটার্নাল ট্রেড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (ম্যাট্রেড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতো ইন্দেরা আবু বকর ইউসুফ জানান, নিবন্ধিত প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে একটি নির্দিষ্ট এআই এজেন্ট ও ব্যক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

 

এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়িক অংশীদার খোঁজা, প্রদর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক ম্যাচমেকিং, বহুভাষিক সহায়তা, প্রদর্শনী কেন্দ্রের বিভিন্ন স্টল খুঁজে পাওয়া, বৈঠক ব্যবস্থাপনা এবং প্রদর্শনী-পরবর্তী যোগাযোগের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

মিহাসের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সংযোগ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে ৬০০ মালয়েশিয়ান রপ্তানিকারকের প্রায় ৪ হাজার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ জন প্রিমিয়াম ক্রেতাও রয়েছেন।

বাংলাদেশি ৬ প্রতিষ্ঠা :
এবারের মিহাসে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে এবং কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ব্যবস্থাপনায় ছয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এগুলো হলো, অ্যাপেক্স কনভেনিয়েন্স ফুডস লিমিটেড, ঘরের বাজার, প্যারাগন অ্যাগ্রো লিমিটেড, তালুকদার অ্যাগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, নরিশ ফুডস লিমিটেড এবং বায়োফার্মা লিমিটেড। এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণও রয়েছে।

প্রাণ আটটি স্টলে স্ন্যাকস, জুস ও ড্রিংকস, কুলিনারি পণ্য, বিস্কুট, বেকারি ও কনফেকশনারিসহ বিভিন্ন হালাল পণ্য প্রদর্শন করছে। পাশাপাশি ফ্লেভারড নুডলস, চকলেট, ওয়েফারসহ নানা ধরনের ভোক্তাপণ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের তৈরি হালাল খাদ্যপণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরির সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।

এফটিএ নিয়ে আশাবা :
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ হাইকমিশনার মানজুরুল করিম খান চৌধুরীর নেতৃত্বে হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন পরিদর্শন করে। হাইকমিশনারের সঙ্গে ছিলেন আয়োজক প্রতিষ্ঠানের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জয় শংকর।
এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ শুধু জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেই নয়, বিনিয়োগের জন্যও সম্ভাবনাময়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কোনো বাণিজ্য চুক্তি না থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এফটিএ হলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে উল্লেখ করেন হাইকমিশনার। একই সঙ্গে বাংলাদেশের এভিয়েশন, মেডিকেল, তথ্যপ্রযুক্তি ও অ্যাগ্রো-প্রসেসিংসহ বিভিন্ন খাতে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে উল্লেখ করে দেশটির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে কার্যকর হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার জন্যও মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের বাজারও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি খাদ্যের নিরাপত্তা, মান, পরিচ্ছন্নতা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কারণে অমুসলিম ভোক্তাদের মধ্যেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে হালাল অর্থনীতি এখন খাদ্যপণ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, লজিস্টিকস, পর্যটন, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে।

এ বাস্তবতায় মিহাস শুধু পণ্য প্রদর্শনীর আয়োজন নয়; বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতা খোঁজা, নতুন বাজারে প্রবেশ, ব্যবসায়িক অংশীদার তৈরি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও দেশীয় হালাল পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।

প্রবাহ বাংলা নেটওয়ার্ক