পর্তুগালে তরুণ প্রজন্ম শিক্ষাক্ষেত্রে এআইমুখী
৯ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ৮৫ শতাংশই জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে
পর্তুগালের শিশু ও কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির ৯ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ৮৫ শতাংশই জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে। পড়াশোনার কাজে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়লেও স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত উদ্বেগ এবং বিভিন্ন তথ্য ও পরামর্শের ক্ষেত্রেও তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এআইয়ের ওপর নির্ভর করছে।
ইইউ কিডস অনলাইন ২০২৫-এর পর্তুগালভিত্তিক গবেষণায় ২ হাজার ১১১ জন শিশু ও কিশোরের ওপর জরিপ চালানো হয়। জরিপটি ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল ৯ থেকে ১৭ বছর। গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআই এখন তরুণদের ডিজিটাল জীবনের একটি কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়েছে।
পড়াশোনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহার
গবেষণার ফল অনুযায়ী, ৪৭ শতাংশ শিশু-কিশোর স্কুলের কাজের জন্য জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের কাজ সম্পন্ন করা, তথ্য বোঝা এবং লেখালেখিতে সহায়তা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ ছাড়া ৪৮ শতাংশ দীর্ঘ লেখা বা তথ্যের সারসংক্ষেপ তৈরিতে এআই ব্যবহার করেছে যা ইউরোপীয় গড়ের তুলনায়ও বেশি।
পর্তুগালের তরুণদের এআই ব্যবহারের মাত্রা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি। গবেষণা বলছে, বিভিন্ন ধরনের এআই কার্যক্রমের বৈচিত্র্য ও ব্যবহারের তীব্রতা দুই ক্ষেত্রেই পর্তুগাল ইউরোপীয় গড়ের ওপরে অবস্থান করছে।
বয়স বাড়লে বাড়ছে এআই নির্ভরতা
পড়াশোনার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের হার বয়সের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ৯ থেকে ১১ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৮ শতাংশ, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ স্কুলের কাজে এআই ব্যবহার করার কথা জানিয়েছে।
অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এআই শুধু বিনোদন বা কৌতূহল মেটানোর উপকরণ হিসেবে নয়, বরং পড়াশোনার নিয়মিত সহায়ক হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, বড় বয়সী শিক্ষার্থীরা এআইকে তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্দেশ্যনির্ভরভাবে ব্যবহার করছে।
স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত উদ্বেগেও এআই
এআই ব্যবহারের পরিধি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। জরিপে ২৩ শতাংশ শিশু-কিশোর শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা ও পরামর্শ নেওয়ার জন্য জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করার কথা জানিয়েছে। একই হারে আরও ২৩ শতাংশ নিজেদের উদ্বেগ বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এআইয়ের সঙ্গে কথা বলেছে এবং পরামর্শ নিয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত ও আবেগগত সহায়তার ক্ষেত্রে পর্তুগালের তরুণদের এআই ব্যবহার ইউরোপীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ইউরোপীয় গড় যেখানে ১৫ শতাংশ, সেখানে পর্তুগালে এই হার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
আর্থসামাজিক বৈষম্যও স্পষ্ট
তবে এআই ব্যবহারে সব তরুণের সুযোগ এক নয়। পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে এআই ব্যবহারের একটি স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
উচ্চ ও মধ্যম আর্থসামাজিক অবস্থানের প্রায় অর্ধেক তরুণ স্কুলের কাজে এআই ব্যবহার করে। বিপরীতে নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থানের তরুণদের মধ্যে এই হার মাত্র ৩৪ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ডিজিটাল বিভাজনের একটি নতুন মাত্রা সামনে এসেছে। আগে ডিজিটাল বৈষম্য বলতে মূলত ইন্টারনেট সংযোগ, ডিভাইস বা প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের পার্থক্য বোঝানো হতো। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, ব্যবহারের ধরন এবং উন্নত এআই সুবিধা পাওয়ার সুযোগও।
অভিভাবক-শিক্ষকদের আগেই পৌঁছে গেছে এআই
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো তরুণদের মধ্যে এআইয়ের বিস্তার অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবক ও শিক্ষকদের সক্রিয় নির্দেশনার আগেই ঘটেছে।
গবেষণার গুণগত অংশে অংশ নেওয়া ১৫ জন পর্তুগিজ কিশোর-কিশোরীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের অনেকেই বন্ধু, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজেদের কৌতূহল থেকে প্রথম এআই ব্যবহার শুরু করেছে। অভিভাবকদের সরাসরি ভূমিকা সেখানে তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
ইনস্টিটিউটো দে কোমুনিকাসাঁও দা নোভা আইসিএনওভা-এর গবেষক এবং প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ক্রিস্তিনা পন্তে এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, পর্তুগালে তরুণদের মধ্যে এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে অনেকটা শিক্ষক ও অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বাইরে।
তার মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে এআই যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে তা শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে। তবে শিক্ষার্থীরা যদি নিজেদের চিন্তা ও পরিশ্রমের পরিবর্তে পুরো কাজ এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে তা শেখার ক্ষমতা ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্রুত উত্তর, কিন্তু সবসময় নির্ভুল নয়
গবেষণায় এআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও উঠে এসেছে। শিশু-কিশোরদের কাছে এআইয়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর দ্রুততা, সহজ ব্যবহার এবং স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক তরুণ এআই কীভাবে কাজ করে বা এর দেওয়া তথ্যের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না।
গবেষণার গুণগত অংশে এমন উদাহরণও পাওয়া গেছে যেখানে এআই গণিতের প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়েছে। অর্থাৎ এআইয়ের উত্তর দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসী শোনালেও তা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে। এ কারণে গবেষকেরা শিশু-কিশোরদের মধ্যে এআই-সাক্ষরতা, তথ্য যাচাই এবং সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভুয়া তথ্য নিয়েও উদ্বেগ
শুধু এআই ব্যবহার নয়, এর মাধ্যমে তৈরি বা প্রচারিত তথ্য নিয়েও তরুণদের উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক অংশগ্রহণকারী ভুয়া খবর এবং অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায় সে বিষয়ে আরও জানতে আগ্রহী।
গবেষকদের মতে, নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করা এখন শিশু-কিশোরদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের ফলে এই চ্যালেঞ্জ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্কুলে এআই ব্যবহারের নতুন বাস্তবতা
গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, স্কুলে এআইকে শুধু নিষিদ্ধ করার বিষয় হিসেবে না দেখে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।
গবেষকেরা মনে করেন, শিক্ষার্থীরা এআই দিয়ে কোনো কাজ করলে শিক্ষকরা কী ধরনের সহায়তা গ্রহণযোগ্য এবং কোন পর্যায়ে তা শিক্ষার্থীর নিজস্ব কাজ হিসেবে গণ্য হবে এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা দিতে পারেন। একই সঙ্গে এআইয়ের ভুল উত্তর, পক্ষপাত, গোপনীয়তা, কপিরাইট এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান দিতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআই-সাক্ষরতা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শিশু-কিশোরদের জানতে হবে এআই কীভাবে কাজ করে, এর সীমাবদ্ধতা কোথায়, কখন এর উত্তর যাচাই করা প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইইউ কিডস অনলাইন ২০২৫-এর পর্তুগালভিত্তিক ফলাফল একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জেনারেটিভ এআই এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; পর্তুগালের একটি বড় অংশের শিশু-কিশোরের কাছে এটি ইতোমধ্যে পড়াশোনা, তথ্য অনুসন্ধান, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত পরামর্শের দৈনন্দিন হাতিয়ার। গবেষকদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন তরুণদের এআই থেকে দূরে রাখা নয়, বরং কীভাবে তাদের নিরাপদ, সমালোচনামূলক ও শিক্ষাবান্ধবভাবে এআই ব্যবহারে সক্ষম করে তোলা যায়।










