স্পেন-মরক্কো নতুন রাজনৈতিক বিতর্কে
সেউতা-মেলিয়াকে ‘মাতৃভূমি’ মরক্কোর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি
সেউতা ও মেলিলার সার্বভৌমত্ব নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মরক্কোর বিচারমন্ত্রী আবদেলতিফ ওয়াহবি দুই শহরের ওপর মরক্কোর ‘ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অধিকার’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন। একই সময়ে মেলিলার পার্লামেন্টে দুই শহরের স্প্যানিশ সার্বভৌমত্ব নিয়ে একটি প্রস্তাবে পিএসওইর বিরোধিতা ঘিরে স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মরক্কোর বিচারমন্ত্রী ওয়াহবি ২১ আগস্ট বলেন, সেউতা ও মেলিলার বর্তমান অবস্থার একটি ‘চূড়ান্ত সমাধান’ প্রয়োজন এবং দুই শহরকে মরক্কোর ‘মাতৃভূমির কোলে’ ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্পেনের সঙ্গে আলোচনার জন্য একটি যৌথ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। তিনি দুই শহরের ওপর মরক্কোর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অধিকারের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
মরক্কোর ধর্মবিষয়ক মন্ত্রীও সেউতা ও মেলিলাকে ঘিরে ‘অধিকৃত ভূখণ্ড মুক্ত করার’ বক্তব্য দিয়েছেন। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে।
স্পেন সরকার মরক্কোর এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেউতা ও মেলিলা স্পেনের অংশ এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
এরই মধ্যে সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসন সংকটের প্রেক্ষাপটে স্পেন সরকার বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। ২৫ আগস্ট সরকার সেউতাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘বিশেষ গুরুত্বের পরিস্থিতি’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং সংকট মোকাবিলায় একক কমান্ড ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থার আওতায় নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং শহরের সরকারি পরিষেবা ও অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মেলিলার প্রেসিডেন্ট ও পিপলস পার্টির নেতা হুয়ান হোসে ইমব্রোদা মরক্কোর দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সেউতা ও মেলিলার অবস্থান নিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না। তিনি স্পেন সরকারের মরক্কো নীতিরও সমালোচনা করে আরও কঠোর ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মেলিলার পার্লামেন্টে পিপলস পার্টি সেউতা ও মেলিলার স্প্যানিশ পরিচয় এবং সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করে একটি প্রস্তাব আনে। প্রস্তাবে বলা হয়, দুই শহর স্পেনের অংশ এবং তাদের সার্বভৌমত্ব ‘প্রশ্নাতীত ও আলোচনার বাইরে’।
প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভোট দেয় মেলিলার পিএসওই। তবে বিষয়টি পিএসওই সেউতা ও মেলিলার স্প্যানিশ পরিচয় অস্বীকার করেছে –এভাবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। পিএসওইর মেলিলা শাখার মুখপাত্র রিদুয়ান মোহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, সেউতা ও মেলিলা স্পেনের অংশ এবং তাদের স্প্যানিশ সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তাঁর দাবি, পিপি এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেই প্রস্তাবটির বিরোধিতা করা হয়েছে।
রিদুয়ান মোহের বক্তব্য অনুযায়ী, পিএসওই মেলিলা ও সেউতার স্প্যানিশ সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করে এবং দুই শহরের সীমান্ত ও নাগরিকদের সুরক্ষার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে। তাঁদের আপত্তি মূলত পিপির আনা প্রস্তাবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে।
মরক্কোর দাবির পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়ে স্পেনে নানা বিশ্লেষণও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, অভিবাসন ও সীমান্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে চাপ সৃষ্টি করে মরক্কো ভবিষ্যতে সেউতা ও মেলিলার ওপর নিজেদের দাবি আরও জোরালো করতে চাইছে। তবে এ ধরনের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বিশ্লেষকের বক্তব্য রয়েছে; এগুলোকে নিশ্চিত সরকারি অবস্থান হিসেবে দেখা যায় না।
সেউতা ও মেলিলা দীর্ঘদিন ধরে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মেলিলা ১৪৯৭ সালে ক্যাস্টিলের অধীনে আসে এবং সেউতার ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব ১৬৬৮ সালের লিসবন চুক্তির মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়। দুই শহর বর্তমানে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডের অংশ।
মরক্কোর সাম্প্রতিক দাবির পর স্পেন একদিকে দুই শহরের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে সেউতার নিরাপত্তা ও অভিবাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ বাড়িয়েছে। ফলে সেউতা ও মেলিলা ইস্যুতে স্পেন-মরক্কো সম্পর্কের পাশাপাশি স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।










